বুধবার ০১ জুলাই ২০২৬

১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্তানের কান্নায় থেমে গিয়েছিল সহমরণ 

যশোরের এক মায়ের গল্প ও সতীদাহ রোধে প্রশাসনের উদ্যোগ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৯:০৭, ৩০ জুন ২০২৬

যশোরের এক মায়ের গল্প ও সতীদাহ রোধে প্রশাসনের উদ্যোগ

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার সমাজজীবনে সতীদাহ বা সহমরণ ছিল এক ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতা। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করতে উৎসাহিত করা হতো, কখনও সামাজিক চাপ, কখনও ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে। কিন্তু এই অমানবিক প্রথার মধ্যেও কিছু ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল যশোরে, যা পরবর্তীকালে সতীদাহ বিষয়ে সরকারি নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলেছিল।


যশোরের এক থানার দারোগার কাছে খবর পৌঁছায় যে, তাঁর এলাকায় এক বৃদ্ধ ব্যক্তির স্ত্রী সতী হতে চলেছেন। সে সময় সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনকে এ ধরনের ঘটনার ওপর নজর রাখতে হতো। খবর পেয়ে দারোগা নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং ওই মহিলার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানতে পারেন, মহিলা নিজের ইচ্ছাতেই সহমরণে অংশ নিতে প্রস্তুত হয়েছেন।
ইতোমধ্যে চিতা প্রস্তুত। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে চিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। চারপাশে উপস্থিত মানুষের চোখে ছিল বিস্ময়, ভক্তি ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি। এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো করুণ আর্তনাদ—“মা, মা!”
কান্নায় ভেঙে পড়া শিশুদের সেই ডাক যেন মুহূর্তেই ভেঙে দিল সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের আবরণ। মহিলা থমকে দাঁড়ালেন, ফিরে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর সন্তানদের। তাদের চোখে জল, মুখে আকুত- “মা, তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না।”


মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মনে জেগে উঠল এক গভীর উপলব্ধি। তিনি যদি চিতায় আরোহণ করেন, তবে এই শিশুদের দেখাশোনা করবে কে? মাতৃত্বের টান ধর্মীয় আচার ও সামাজিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠল। তিনি সিদ্ধান্ত বদলালেন, সন্তানদের বুকে টেনে নিলেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি আর সতী হবেন না।
দেবী হওয়ার চেয়ে মা হয়ে থাকাই তাঁর কাছে তখন অধিক মূল্যবান মনে হয়েছিল।


এই নাম-না-জানা যশোরের মায়ের ঘটনা ছিল মানবিকতার এক শক্তিশালী প্রকাশ। ইতিহাসবিদ স্বপন বসু তাঁর ‘সতী’ গ্রন্থের ‘সতী, তুমি মাতা নহ?’ অধ্যায়ে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে সতীদাহ বিষয়ে যে সরকারি বিধিনিষেধ জারি করা হয়, সেখানে শিশু সন্তানের জননী নারীদের সতী হওয়া নিয়ে বিশেষ সতর্কতা আরোপ করা হয়েছিল। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তখনও অমীমাংসিত ছিল- কত বয়স পর্যন্ত সন্তান থাকলে সেই বিধিনিষেধ কার্যকর হবে?
সরকারি ঘোষণায় বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ফলে সরকার বিষয়টি নিয়ে নিজামৎ আদালতের শরণাপন্ন হয়। কিছুদিন পর আদালত এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত প্রদান করে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যে-সব মায়ের তিন বছরের কম বয়সি সন্তান রয়েছে এবং যে-সব শিশু অন্যের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকতে সক্ষম নয়, তাদের মায়ের সতী হওয়া অনুমোদিত হবে না।


এই সিদ্ধান্ত ছিল সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে মানবিক বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যদিও তখনও সতীদাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়নি, তবুও শিশুদের স্বার্থ এবং মাতৃত্বের দায়িত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসন প্রথাটির বিরুদ্ধে সীমিত হলেও একটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
তবে বাস্তবতা ছিল কঠোর। সরকারি বিধিনিষেধ ও প্রশাসনিক নজরদারি সত্ত্বেও সতীদাহ অব্যাহত ছিল। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে শুধু যশোর জেলাতেই ৩০ জন নারী সতী হয়েছিলেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই ৩০টি ঘটনার মধ্যে ২৯টিতেই পুলিশ উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ প্রশাসন ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রতিরোধ করতে পারেনি।
যশোরের সেই অজ্ঞাতনামা মায়ের গল্প আজও ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ধর্মীয় অনুশাসন বা সামাজিক চাপে নয়, সন্তানের প্রতি মমতা এবং জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন মায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাঁর সিদ্ধান্ত শুধু কয়েকটি শিশুর জীবন রক্ষা করেনি, বরং সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে প্রশাসনিক ও মানবিক চিন্তার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: