বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬

১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসের পাতায় এল. বি. মিত্র

বিদ্যাসাগরের স্নেহধন্য এক চিকিৎসক

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১২:৩৮, ২৪ জুন ২০২৬

বিদ্যাসাগরের স্নেহধন্য এক চিকিৎসক

যশোর মাইকেল মধুসূদন দত্ত মহাবিদ্যালয়ের পুরাতন ক্যাম্পাসে একসময় ছিল একটি ঐতিহাসিক হোস্টেল, নাম এল. বি. মিত্র হল। এখানেই যশোরের ভাষা আন্দোলনকারীরা প্রথম বৈঠক করেছিলেন। এখন সেই হলটি আর নেই। কিন্তু ইতিহাসে থেকে গেছে সেই নাম, এল. বি. মিত্র। কে ছিলেন এই মানুষটি?


এল. বি. মিত্র বা লালবিহারী মিত্র ছিলেন ঊনবিংশ শতকের যশোরের এক কৃতী সন্তান। জন্ম ১৮৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে যশোর জেলার লেবুতলা গ্রামে। তাঁর পরিবার ছিল বিদ্যাশীল ও সংস্কৃতিমনা। ধনসম্পদে তেমন প্রাচুর্য না থাকলেও এই মিত্রবংশের লোকেরা জ্ঞানচর্চা, সততা ও চরিত্রগুণে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। লেবুতলার মিত্র বংশের আদি নিবাস ছিল কলকাতার কাছে বরিষা গ্রামে। সেখানকার কালীদাস মিত্রের বংশধর বসন্ত মিত্র যশোরে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।


লালবিহারীর পিতা পিতাম্বর মিত্র ছিলেন গ্রাম্য আদালতের আইনজীবী। তিনি ধর্মভীরু, অতিথিপরায়ণ ও মানবদরদি ছিলেন। তাঁর পরিবারেও শিক্ষার আলোক ছড়িয়েছিলেন অনেকে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মাধবচন্দ্র ও খুড়তুতো ভাই বিষ্ণুচরণ মিত্র ছিলেন শিক্ষক, আরেক ভাই বঙ্কুবিহারী মিত্র ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের কৃতী ছাত্র ও চিকিৎসক।


লালবিহারীর শিক্ষা শুরু হয় যশোর জিলা স্কুলে। আর্থিক টানাপড়েনের কারণে পরবর্তীতে তাঁর মাতুল কালীচরণ ঘোষ, চৌগাছার ঘোষ বংশীয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তাঁর শিক্ষার ভার নেন। তিনি কৃষ্ণনগর কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। সেই কলেজে তখন অধ্যাপক ছিলেন রামতনু লাহিড়ী ও উমেশচন্দ্র দত্ত, যাঁদের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন লালবিহারী। দারিদ্র্যের কারণে পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন গৌরনগর হাই স্কুলে। অবসরে তিনি ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে গভীর অধ্যয়ন করেন।


চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজেন্দ্র দত্ত ও কালীকৃষ্ণ মিত্রের সঙ্গে। তাঁদের প্রভাবে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। কলেজ ছেড়ে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন এবং খুব দ্রুতই সুদক্ষ ও মানবদরদি চিকিৎসক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
১৮৭০ সালে বিদ্যাসাগর ও কালীচরণ ঘোষের পরামর্শে তিনি কলকাতায় ফিরে যান এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি কলকাতায় নিজের একটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা সে সময় ভারতের অন্যতম সেরা চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি পায়। বিদ্যাসাগর, মহেন্দ্রলাল সরকার, এমনকি তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড রিপনও তাঁর রোগী ছিলেন।


এল. ভি. মিত্র বিনা পারিশ্রমিকে অসংখ্য দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসা দিতেন। নিজের অর্থে ওষুধ ও পথ্য কিনে দিতেন। রোগীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলতেন, তাঁদের মনোবল জুগিয়ে দিতেন। জীবনে কখনো আত্মপ্রচার করেননি। ১৯২২ সালের ২৭ আগস্ট, ৭৭ বছর বয়সে লালবিহারী মিত্রের জীবনাবসান ঘটে।


তাঁর মৃত্যুতে তৎকালীন সমাজ বলেছিল- ‘একজন দরিদ্রবৎসল চিকিৎসক এবং এক খাঁটি মানবিক মানুষ চলে গেলেন।’
তাঁর একমাত্র পুত্র মণীন্দ্রনাথ মিত্র কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি ছিলেন এবং স্যার দেব প্রসাদ সর্বাধিকারীর জামাতা।
লাল বিহারী মিত্র মারা গেলে, তার পরিবার ‘যশোর কলেজ’ (পরে নাম হয় মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠার সময় অর্থ দান করেন। সেই অর্থে কলেজ ক্যাম্পাসে একটি হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। হোস্টেলের নামকরণ করা হয় এলবি মিত্র হল। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: