জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজায়ন সম্প্রসারণে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় খুলনা কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় মোট প্রায় দুই লাখ চারা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও জুন মাসের শেষ পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম চারা বিতরণ হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, দ্রুতগতিতে বিতরণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) খুলনা অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল—এই চার জেলায় মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯০০টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত ৩০ জুন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৯৩ হাজার ৯৪৫টি চারা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৮ শতাংশ।
জেলাভিত্তিক অগ্রগতি
চারা বিতরণে চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাগেরহাট। সেখানে ৫৬ হাজার ৩০০টি চারার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার ১৫৫টি, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৬ শতাংশ। সাতক্ষীরায় ৪৮ হাজার ৬০০টি চারার মধ্যে ৩৭ হাজার ১১০টি বিতরণ হয়েছে, যা প্রায় ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে খুলনায় ৬৭ হাজার ৯৫০টি চারার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৬৮০টি, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৩ শতাংশ।
সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে নড়াইল। সেখানে ২৩ হাজার ৫০টি চারা বিতরণের লক্ষ্য থাকলেও ৩০ জুন পর্যন্ত বিতরণ কার্যক্রম শুরুই হয়নি। তবে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই সেখানে বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে।
৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা
চলতি অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের আওতায় দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে ১৬ লাখ ২৮ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ইনপুটস-২ উইংয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, চারাগুলো চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি চারার সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে—৩০ কেজি জৈব সার, একটি বাঁশের খুঁটি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়ক উপকরণ। এর ফলে চারার পরিচর্যা সহজ হবে এবং বেঁচে থাকার হারও বাড়বে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।
ডিএই খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি কৃষক বা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটি করে চারা দেওয়া হচ্ছে। এসব চারা বাড়ির আঙিনা, পতিত জমি, খালের পাড়, রাস্তার ধারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খালি জায়গায় রোপণ করা যাবে।
তিনি বলেন, ‘উপকারভোগীদের কৃষি কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর যাচাই করে মাস্টার রোলের মাধ্যমে চারা বিতরণ করা হচ্ছে। এতে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের বাড়তি আয়ও নিশ্চিত করতে পারে। ফলজ গাছ থেকে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফল বিক্রি করে আয় করা সম্ভব। বনজ গাছ কাঠের চাহিদা পূরণে সহায়ক, আর ঔষধি গাছ স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ভেষজ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাপক বৃক্ষরোপণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, কার্বন শোষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটির ক্ষয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
গতি বাড়ানোর প্রয়োজন
যদিও বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় চারা বিতরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে খুলনা ও নড়াইলের ধীরগতির কারণে সামগ্রিক কর্মসূচির অগ্রগতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
কৃষি বিভাগ আশা করছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত চারা বিতরণ সম্পন্ন হবে এবং সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে খুলনা অঞ্চলও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।


























