বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলা। দেশের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানি করতে হয়, যার ফলে ব্যয় হয় কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এই আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার প্রণোদনার মাধ্যমে তুলা চাষ সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
কিন্তু সেই উদ্যোগের মাঠপর্যায়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যশোর অঞ্চলের তুলা চাষিদের দাবি, তাদের চাহিদা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তুলাবীজ গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে চলতি মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকের পছন্দ এক, সরবরাহ আরেক
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের যশোর জোনের আওতায় মণিরামপুর, ঝাঁপা, যশোর সদর, খাজুরা, ঝিকরগাছা-১ ও ২, কেশবপুর, শার্শা, উলাসী, চৌগাছা, হাকিমপুর, পোড়াপাড়া, চুকনগর, বারোবাজার ও কালীগঞ্জসহ ১৬টি তুলা উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটের আওতায় প্রায় তিন হাজার প্রণোদনাপ্রাপ্ত কৃষক এ বছর তুলা আবাদ করবেন।
কৃষকদের অভিযোগ, তারা সুপ্রিম সিড কোম্পানির ‘হোয়াইট গোল্ড-১’ ও ‘হোয়াইট গোল্ড-২’ জাতের বীজ চাইলেও তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ইস্পাহানি কোম্পানির ‘লাল তীর’ ও ‘বিএম-৪’ ব্র্যান্ডের বীজ।
একাধিক কৃষকের দাবি, কয়েক বছর আগে লাল তীর ব্র্যান্ডের বীজ ব্যবহার করে প্রত্যাশিত ফলন পাননি। অন্যদিকে চলতি মৌসুমে হোয়াইট গোল্ড জাতের বীজ ব্যবহার করে প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত বীজ তুলা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
সরেজমিনে কথা হয় চৌগাছার জগদীশপুর গ্রামের মাসুদ হোসেন, বেড়গোবিন্দপুর গ্রামের হারুন ও বাবলুর রহমান, কোমরপুর গ্রামের আব্দুর রহিম, ঝিকরগাছার রাজাপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম, শিওরদাহ গ্রামের শিমুল হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক, লক্ষ্মীপুর গ্রামের আসাদুজ্জামান ও জাহাঙ্গীর হোসেনসহ একাধিক তুলা চাষির সঙ্গে।
তাদের অভিযোগ, অঙ্কুরোদগম কম এবং ফলন নিয়ে প্রশ্ন থাকায় তারা লাল তীর ব্র্যান্ডের বীজ নিতে অনাগ্রহী। কিন্তু প্রণোদনার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও ভয় পাচ্ছেন অনেকেই।
কৃষকদের অভিযোগ, যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান মাঠপর্যায়ের ইউনিট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোম্পানির বীজ বিতরণে চাপ সৃষ্টি করছেন।
যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
এদিকে ঝিকরগাছা ইউনিট-১-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদ হোসেন দাবি করেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী লাল তীর ব্র্যান্ডের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। তার ইউনিটে গত বছর ৪৫০ জন কৃষক তুলা চাষ করলেও এ বছর সেই সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তিনি জানান।
চৌগাছা ও হাকিমপুর ইউনিটের কর্মকর্তা আবু সাঈদ জানান, ৫৩০ জন কৃষকের জন্য ৩৫০ কেজি বীজের চাহিদার বিপরীতে এখন পর্যন্ত ১৪৩ কেজি লাল তীর ব্র্যান্ডের চায়না হাইব্রিড বীজ সরবরাহ পেয়েছেন।
তবে কৃষকদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বীজ বিতরণ করা হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যা বরাদ্দ পাই, তাই কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করি।’
উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা
এ বছর যশোর অঞ্চলের তিন হাজার কৃষক প্রায় তিন হাজার বিঘা জমিতে তুলা চাষ করবেন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মণ বীজ তুলা উৎপাদনের। প্রতি বিঘায় গড়ে ১২ থেকে ১৫ মণ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। বাজারে প্রতি মণ বীজ তুলার দাম প্রায় চার হাজার টাকা। সে হিসাবে একজন কৃষক প্রতি বিঘায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
প্রণোদনার আওতায় প্রত্যেক কৃষক ৬০০ গ্রাম তুলাবীজ, সার ও কীটনাশক পান, যার আর্থিক মূল্য প্রায় আট হাজার টাকা।
কৃষকদের অভিযোগ, ইতোমধ্যে কালীগঞ্জ ও বারোবাজার ইউনিটে বিতর্কিত ৬০ কেজি বীজ বিতরণ করা হয়েছে। একইভাবে অন্য ইউনিটগুলোতেও একই বীজ সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে।
তাদের আশঙ্কা, নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করলে উৎপাদন কমে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষক এবং সরকারের তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যও ব্যাহত হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা নতুন শঙ্কা
স্থানীয় প্রবীণ কৃষকরা জানান, ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে যশোর অঞ্চলে তুলা চাষে এক ধরনের বিপ্লব ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে সেই সম্ভাবনাময় খাত প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
দীর্ঘ বিরতির পর গত কয়েক বছরে আবারও তুলা চাষে আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এবার যদি নিম্নমানের বীজ বিতরণের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় খাত আবারও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের যশোর জোনের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোজাদ্দেল আল শামীমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সরকার কৃষকদের বিনামূল্যে প্রণোদনার বীজ দেয়। লাল তীর কিংবা সুপ্রিম—কোনো কোম্পানির বীজই খারাপ নয়। সব বীজেরই গুণগত মান ও উৎপাদন ভালো। বীজ আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি গেজেট, চাহিদাপত্র ও রেজুলেশনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে বীজ সরবরাহ করতে না পারলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়। আমরা সবসময় কৃষকের স্বার্থকেই গুরুত্ব দিই।’
বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তা শুধু কয়েক হাজার কৃষকের ক্ষতির কারণ হবে না; বরং দেশের তুলা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর জাতীয় লক্ষ্যও ব্যাহত হবে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে বীজের গুণগত মান যাচাই, কৃষকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রণোদনা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এতে কৃষকের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের সম্ভাবনাময় তুলা খাতও টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।


























