রোববার ১২ জুলাই ২০২৬

২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সফল উদ্যোক্তা 

মাশরুম চাষে বদলে গেছে শাহাজালালের জীবন

বসির আহাম্মেদ, ঝিনাইদহ

প্রকাশিত: ১২:৫৩, ১২ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১২:৫৬, ১২ জুলাই ২০২৬

মাশরুম চাষে বদলে গেছে শাহাজালালের জীবন

ইচ্ছাশক্তি, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে সফলতার পথ খুব বেশি দূরে থাকে না। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাগান্না ইউনিয়নের বাটিকাডাঙ্গা পূর্বপাড়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা শাহাজালাল সেই বাস্তবতারই এক অনন্য উদাহরণ। মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা মাশরুম চাষের উদ্যোগ আজ একটি সফল বাণিজ্যিক খামারে রূপ নিয়েছে। নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি চারজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তিনি এখন এলাকার তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক।


একসময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন শাহাজালাল। কিন্তু নিরাপদ, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদনের স্বপ্ন তাকে ভিন্ন পথে হাঁটার সাহস জোগায়। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রোজিনা পারভিনের উৎসাহ ও কারিগরি পরামর্শে প্রায় চার বছর আগে চাকরি ছেড়ে শুরু করেন মাশরুম চাষ। শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু পরিকল্পনা ছিল বড়।
প্রশিক্ষণেই সফলতার ভিত্তি
উদ্যোক্তা হওয়ার আগে মাগুরায় বেসরকারিভাবে মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ নেন শাহাজালাল। পরে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আওতায় ১১ দিনব্যাপী ‘অন দ্য জব’ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাশরুম উৎপাদনের কৌশল রপ্ত করেন। প্রশিক্ষণ শেষে মাত্র ২০০টি এক কেজি স্পন প্যাকেট দিয়ে শুরু হয় তার যাত্রা। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজারটি স্পন প্যাকেট, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। প্রতিটি স্পন প্যাকেট তৈরিতে কাঠের গুঁড়া ও গমের আটা নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর বীজ সংযোজনের এক মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিটি প্যাকেট থেকে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম মাশরুম পাওয়া যায়।
মাসে বিক্রি দেড় লাখ টাকার বেশি
শাহাজালালের উৎপাদিত মাশরুম শুধু ঝিনাইদহেই নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি মাসে তিনি ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মাশরুম বিক্রি করেন। উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে তার মাসিক নিট লাভ থাকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মাশরুম ২৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বর্জ্য নয়, বাড়তি আয়ের উৎস
মাশরুম উৎপাদনের পর ব্যবহৃত স্পন প্যাকেট ফেলে না দিয়ে সেগুলো থেকে উন্নতমানের জৈব সার উৎপাদন করছেন শাহাজালাল। এফওয়াইএম (ঋধৎস ণধৎফ গধহঁৎব) পদ্ধতিতে তৈরি এই জৈব সার প্রতি কেজি ১০ টাকা এবং প্রতি মণ ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ফলে একই উপকরণ থেকে মাশরুম ও জৈব সার—দুই ধরনের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষিরও একটি কার্যকর মডেল গড়ে তুলেছেন তিনি।
কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র
বর্তমানে শাহাজালালের খামারে স্থায়ীভাবে চারজন কর্মী কাজ করছেন। স্থানীয় তরুণদের অনেকেই খামার পরিদর্শনে এসে মাশরুম চাষ সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন এবং উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয়দের মতে, এই খামার এখন শুধু উৎপাদনের কেন্দ্র নয়; এটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিরও একটি অনুপ্রেরণার স্থান।
সরকারি সহায়তা পেলে বাড়বে উৎপাদন
শাহাজালাল বলেন, ‘মানুষের কাছে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আমি মাশরুম চাষ শুরু করি। শুরুতে অনেক প্রতিকূলতা ছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আজ এই অবস্থানে আসতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে চাই এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চাই।’
তিনি জানান, ইনোকুলেশন ল্যাব স্থাপনের জন্য একটি ল্যামিনার এয়ার ফ্লো ও জীবাণুমুক্তকরণের জন্য একটি অটোক্লেভ মেশিন প্রয়োজন। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে।
কৃষি বিভাগের মূল্যায়ন
উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রোজিনা পারভিন বলেন, ‘শাহাজালাল একজন পরিশ্রমী, মেধাবী ও সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোক্তা। শুরু থেকেই তাকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি সেই পরামর্শ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সফলতা অর্জন করেছেন। বর্তমানে তার খামারে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরকারি সহায়তা পেলে শাহাজালাল আরও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করতে পারবেন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং বেকারত্ব দূরীকরণে মাশরুম চাষ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
দেশে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সেই চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি, জৈব সার উৎপাদন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শাহাজালালের উদ্যোগ একটি সফল মডেল হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এমন হাজারো তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: