মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬

২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রম-ঘামে গড়া অবকাঠামোবিহীন বাজারে কোটি টাকার অর্থনীতি

উবাঈদ সামি

প্রকাশিত: ১৬:২৩, ১৩ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১৬:২৪, ১৩ জুলাই ২০২৬

শ্রম-ঘামে গড়া অবকাঠামোবিহীন বাজারে কোটি টাকার অর্থনীতি

সপ্তাহে দুই দিন কোটি টাকার পান-সুপারির বেচাবিক্রি হয় যশোর শহরের বড়বাজারের পাইকারি পানের হাটে। গত ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস এটি। একই সঙ্গে কৃষি-অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার চাষিদের পান- সুপারি বিক্রির কেন্দ্রস্থল এই হাট। অথচ দীর্ঘদিনেও এখানে প্রয়োজনীয় বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কোনো দপ্তর। ফলে শেড, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও শৌচাগার ছাড়াই চলছে এই কোটি টাকার পাইকারি হাট।

পানচাষিরা জানান, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এখানে বাজার অবকাঠামো বলতে কিছুই নেই। শেড না থাকায় খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে রাস্তার ওপর বসে পান-সুপারি বিক্রি করতে হয়। নেই পানির ব্যবস্থাও । যানজটের কারণে পান-সুপারি বহনকারী যানবাহন ঠিকমতো বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার এই সমাগম স্থলে নেই কোনো শৌচাগার । অথচ প্রতি হাটবারে খাজনার টাকা গুনতে হয়। একটি মহল প্রতি হাটে অর্ধলক্ষাধিক টাকারও বেশি ‘টোল’ আদায় করে ।


সরেজমিনে ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম এই পাইকারি হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন- শনিবার ও বুধবার। এই দুই দিনেই এখানে কোটি কোটি টাকার পান-সুপারি কেনা-বেচা হয়। এলসি পান, সাচি পান, মিষ্টি পান, ঝাল পান, সিলেটি পান, মহেশখালির পান এবং পটুয়াখালীর পান এখানে বিক্রি হয়। যশোর ছাড়াও ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, হুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলা থেকে শত শত পাইকারি ব্যবসায়ী এখানে পান-সুপারি নিয়ে আসেন ।
জানা গেছে, বিক্রেতা ও উৎপাদকদের বড় একটি অংশ আসেন ঝিনাইদহের মহেশপুর, কোটচাদপুর ও কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে। প্রত্যেক হাটে ৪৫০ থেকে ৫০০ জন পানচাষি সরাসরি মাঠ থেকে উৎপাদিত পান নিয়ে আসেন। পাশাপাশি বহুসংখ্যক ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী চাষিদের কাছ থেকে পান সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। এ ছাড়া প্রায় ২৫ জন স্থায়ী সুপারি ব্যবসায়ীও এই বাজারকে কেন্দ্র করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।


হাটটির ব্যবসায়ীরা জানান, সপ্তাহের দুই হাটে কয়েক কোটি টাকার পান ও সুপারি কেনা-বেচা হয়। ভরা মৌসুমে এই বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ফলে বছরে শতকোটি টাকার বাণিজ্য হয়, যা হাজারো কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ীর জীবিকার উৎস।


ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দুলারমুন্দিয়া গ্রামের প্রদীপ কুমার ঘোষ বলেন, ‘আমি ৪০ বছর ধরে পান চাষ করছি। যশোরের বাজারে পান নিয়ে এলে ভালো দাম পাওয়া যায় বলেই এত দূর থেকে আসি। তবে অন্য বাজারের তুলনায় এখানে খাজনার হারও বেশি। ক্রেতা ও ফড়িয়া উভয়কেই ‘ঢোপ’প্ৰতি ১৫ টাকা করে খাজনা দিতে হয়, যা আমাদের মতো প্রান্তিক চাষিদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
ঝিকরগাছার বোধখানা গ্রামের পানচাষি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার তিন বিঘা পানের বরজ আছে। আমি নিয়মিত এই বাজারে পান বিক্রি করি। এখানে দাম ভালো পাওয়া যায়। তবে বড় সমস্যা হলো এই বাজারের অবকাঠামোগত দুর্বলতা। বসার কোনো স্থায়ী জায়গা নেই। মাথার ওপর শেড় বা চালা নেই ৷ শৌচাগার না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা চাষিরা নানা দুর্ভোগে পড়েন। পটুয়াখালী থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে পান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যশোরের এই বাজারে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পান পাওয়া যায় ।


হাটটিতে ৪০ বছর ধরে সুপারি ব্যবসা করছেন বিপুল রায়। তিনি বলেন, ‘প্রতি হাটে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করি। এই হাটই আমার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব খরচ এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। মাথার ওপর চালা না থাকায় বৃষ্টি হলেই দুর্ভোগ শুরু হয়। গরমের দিনে রোদের তাপে পুড়তে হয়। স্থায়ী শেড না থাকায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।'
চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, দ্রুত আধুনিক বাজার অবকাঠামো ও বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হোক। তাহলে কৃষকদের দুর্দশা যেমন লাঘব হবে, তেমনি সরকারও রাজস্ব আয় করতে পারবে।
জাতীয় কৃষক খেত মজুর সমিতির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, পান চাষের সঙ্গে শুধু চাষিরাই নন, খেতমজুর, পরিবহন শ্রমিক, পাটচাষি এবং বিভিন্ন সহযোগী পেশার মানুষও জড়িত। তাই পান খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন ।


এ ব্যাপারে জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য ও জাতীয় কৃষক শক্তির জেলা সংগঠক সালমান হাসান রাজিব বলেন, পান-সুপারির মতো একটি অর্থকরী ফসলের বাজার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন। অথচ এ রকম একটি বাজার গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিল কৃ ষি বিভাগের। তিনি বলেন, বাজার কাঠামোর উন্নয়নের দায়িত্ব কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওপর বর্তায়। বাজারটি যেহেতু যশোর পৌরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন, সেহেতু স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সমন্বয় করে তারা এটি করতে পারত। কিন্তু আমার যতদূর জানা, এই বাজারের সঙ্গে কৃষি-সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের কোনো সংযোগই নেই।


যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুণ্ডু বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাজারটি এখনো ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কেউ যদি পৌরসভার নামে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করে থাকে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বাজারটিকে আধুনিক ও সুসংগঠিত করতে স্থায়ী হাটচান্নি ও অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে ।


কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, যশোরের এই বাজারে সপ্তাহে কোটি টাকার বেশি বেচাকেনা হয়। বাজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হলেও কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, বাজার বিশ্লেষণ, প্রশিক্ষণ এবং বিপণন-সহায়তা দেওয়ার কাজ কৃষি বিপণন অধিদপ্তর করে থাকে।


যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, এই বাজার থেকে কৃষক যাতে লাভবান হন, সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখা হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের ২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, যশোর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৩ থেকে ১ হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পান চাষ হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পান উৎপাদনে যশোর দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে জেলায় বছরে প্রায় ৯ হাজার ৬৬৯ দশমিক ৫১ মেট্রিক টন পান উৎপাদিত হচ্ছে। এই উৎপাদন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: