সোমবার ২০ জুলাই ২০২৬

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণের চাপে আব্দুলপুরের কৃষকরা

টানা বৃষ্টিতে যশোরে সবজির চারা উৎপাদনে কোটি টাকার ক্ষতি

সালমান হাসান রাজিব

প্রকাশিত: ১৬:০৭, ১৯ জুলাই ২০২৬

টানা বৃষ্টিতে যশোরে সবজির চারা উৎপাদনে কোটি টাকার ক্ষতি

আকাশে মেঘ জমলেই পলিথিনের ছাউনি দিয়ে সবজির চারার বেড ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন আব্দুলপুর মাঠের চাষিরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির বৈরিতার কাছে হার মানতে হয়েছে। ছাউনি দিয়ে টানা ভারী বৃষ্টি ঠেকানো গেলেও জলাবদ্ধতায় প্রায় ৭০ বিঘা জমির পাতাকপির অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও বেগুন, টমেটো, ফুলকপি ও ঝালসহ অন্যান্য সবজির চারা এবং সদ্য রোপণ করা বীজ পচে গেছে। এতে কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধার দাবি জানিয়েছেন তারা।


চাষিরা জানান, এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চারা উৎপাদন করেছেন তারা। চারা নষ্টের ফলে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় মাথার ওপর ঋণের বোঝা বেড়ে চলেছে। তারা অভিযোগ করেন, আব্দুলপুর মাঠের পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত কালভার্টটি ছোট ও অপ্রশস্ত। ফলে বছরভর জলাবদ্ধতার সংকট থাকে।


সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামের চাষিরা বছরে কমবেশি ১৫ কোটি টাকার চারা উৎপাদন ও বেচাকেনা করেন। চার দশকের বেশি আগে এই সবজির চারা উৎপাদনের কারবার গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বিনামূল্যের সার, বীজ ও কীটনাশকের আওতায় নেই এখানকার চারা উৎপাদকরা। ফলে উৎপাদনের মূলধনের জন্য এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যে-কোনো কারণে উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে লোকসান ও ঋণের বোঝা নিয়ে দুশ্চিন্তা, দুর্ভোগ ও সংকটে পড়তে হয়।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদক যখন আব্দুলপুর মাঠে গিয়েছিলেন, তখন আকাশজুড়ে হঠাৎই মেঘের ঘনঘটা শুরু হয়। আর তখন চারা বাঁচাতে পলিথিন হাতে ছোটাছুটি শুরু করেন চাষিরা। চারপাশে পুঁতে রাখা বাঁশের চারটি ছোট খুঁটির সঙ্গে পলিথিন বেঁধে শেড বা ছাউনি দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা।
মাঠটির কৃষকদের সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকে ঘুরে দেখা যায়, বহু বেড চারা নষ্ট হয়ে খালি পড়ে আছে। যে-সব বেডে এখনও চারাগাছ আছে, সেগুলোরও বেশিরভাগ নষ্টের উপক্রম হয়েছে। মাঠটির চাষি জাকির হোসেন বেডে অবশিষ্ট থাকা চারাগুলোর একটি থেকে আরেকটি হাত দিয়ে সরিয়ে দেখিয়ে বলেন, এগুলোর গোড়া পচে গেছে। দুই-একদিনের মধ্যে মরে যাবে। এই চারা কেউ কিনবে না। তিনি বলেন, ৯০টি বেডের বেশিরভাগ চারার গোড়া জলাবদ্ধতায় পচে গেছে। রোপণ করা সব বীজও নষ্ট হয়ে গেছে। এতে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।


আরেক কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ৪২ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা ছিল। পাশাপাশি এসব ফসলের বীজও রোপণ করেছিলেন। গত ১০ ও ১১ জুলাইয়ের টানা বৃষ্টিতে বেশিরভাগ চারা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রোপণ করা সব বীজ পচে গেছে। তিনি বলেন, একটি বেড তৈরি করতে শ্রমিক খরচ ছাড়াও সার ও বীজের দাম মিলিয়ে ৪ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। বর্তমানে বীজের দামও অনেক বেশি। পাতাকপির একেক প্যাকেট বীজের দাম ৯০০ টাকা। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আব্দুলপুর গ্রামের সবজির চারা উৎপাদনকারী চাষিরা বলেন, ধান, পাট, গম ও ভুট্টাসহ অন্যান্য চাষাবাদে সরকারি প্রণোদনা সহায়তা মেলে। এসব চাষি বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক সুবিধা পান। কিন্তু এখানকার চাষিরা বছরভর কোটি কোটি টাকার সবজির চারা উৎপাদন করলেও প্রণোদনার আওতার বাইরে রয়েছেন। চারা উৎপাদনের পুঁজি জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। উচ্চমূল্যের সার, বীজ ও কীটনাশকের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে। এমন অবস্থায় চারা ও বীজ নষ্ট হওয়ায় আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি ঋণের বোঝাও বেড়েছে।


আব্দুলপুরের আরেক চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৩৩ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি ও বেগুনের চারা উৎপাদনে নেমেছিলেন। দুদিনের বৃষ্টিতে আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। চারা নষ্ট ও বীজ পচে আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, কিস্তি ঠিকমতো পরিশোধ করতে না পারায় ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতি উত্তরণে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে সরকারি ঋণসুবিধা পেলে সবজির চারা উৎপাদনকারীরা উপকৃত হতেন।


এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ না নিয়ে কৃষি ব্যাংক বা এ ধরনের ঋণ দেয় এমন ব্যাংকের সুবিধা কেন নেন না- এ প্রশ্নের জবাবে সবজির চারা উৎপাদনকারী চাষি আসাদুজ্জামান বলেন, ঋণ নিতে গেলে নানা কাগজপত্র চায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কাগজপত্র তৈরি ও জমা দিতে দিনের পর দিন ব্যাংকে ঘুরতে হয়। তারপরও ঋণ পাওয়া যায় না। দেখা যায়, এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ঋণ মিললেও মৌসুম শেষ হয়ে যায়। তিনি বলেন, এনজিও ঋণ নিয়ে ১০ শতক জমিতে উৎপাদিত ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন ও টমেটোর চারা এবং রোপণ করা সব বীজ নষ্ট হয়ে লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা অবস্থায় রয়েছি। আরেকটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আবার নতুন করে শুরুর চেষ্টা করছি।


৩৩ শতক জমিতে চারা ও বীজ নষ্টে ক্ষতির শিকার চাষি জাকির হোসেনের ভাষ্য, কৃষি সেক্টরের চারা উৎপাদনের এই খাতটি একদম অবহেলিত। কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এ খাতটি প্রণোদনা ও ঋণসুবিধার আওতায় নেই। সরকারের এদিকে নজর দেওয়া উচিত।
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ৬৬ শতক জমিতে চারা উৎপাদন করেছিলাম। বেড তৈরি থেকে শুরু করে বীজ, সার ও পরিচর্যায় লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তিনি বলেন, মাঠের পানি নিষ্কাশনের কালভার্টটি অত্যন্ত ছোট। সরু ও অপ্রশস্ত হওয়ায় পানি নিষ্কাশন না হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টদের কাছে নতুন করে প্রশস্ত একটি কালভার্ট নির্মাণের দাবি জানাই।


এ ব্যাপারে ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, দুদিনের টানা বৃষ্টিতে পানি জমে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। অন্যান্য সবজি ও ফসলের আবাদ করে কীভাবে এই ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: