আমন ধান রোপণের ভরা মৌসুম। অথচ যশোরের মাঠে এখন সারের জন্য হাহাকার। সরকারি হিসাব বলছে, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ডিলার ও সাব-ডিলারদের দোকানে সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার। বাধ্য হয়ে অনুমোদনহীন দোকান থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে সার কিনছেন কৃষকরা। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো জমি প্রস্তুত ও ধান রোপণ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
যশোরের চৌগাছা, শার্শা ও সদর উপজেলাসহ জেলার আটটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে আমন চাষ পুরোদমে চললেও কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার মিলছে না। সবচেয়ে বেশি সংকট ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারে।
চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের বাড়ীয়ালী গ্রামের কৃষক আলী কদর বলেন, ‘সাব-ডিলারের কাছে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সার কিনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা দিতে পারছে না। অথচ অনুমোদনহীন দোকানে গেলে দুই গুণ বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে।’
একই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাব-ডিলার কামরুল ইসলাম জানান, তাঁর এলাকায় ৫৪৫ জন কৃষক রয়েছেন। অথচ তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০ বস্তা ডিএপি, ১০ বস্তা এমওপি, ৫৫ বস্তা টিএসপি ও ১০০ বস্তা ইউরিয়া।
তিনি বলেন, ‘এখন আমন রোপণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কৃষকের প্রয়োজনের তুলনায় যে বরাদ্দ পেয়েছি, তা খুবই অপ্রতুল। কৃষকদের কোনো সমাধান দিতে পারছি না।’
৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাব-ডিলার কিংকর হালদারও একই অভিযোগ করে বলেন, ‘কৃষক টাকা নিয়েও সার পাচ্ছেন না। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় আমরা বিপাকে পড়েছি।’
শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের গোকর্ণ গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের প্রথম চাষে সার না দিলে ভালো ফলন হয় না। কিন্তু এখন ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এমওপি—সব সারেরই সংকট। মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে কর্মকর্তাদের বক্তব্যের কোনো মিল নেই।’
সদর উপজেলার চুরামনকাটি ইউনিয়নের জগহাটি গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়া ২৫ টাকা, ডিএপি ১৯ টাকা, টিএসপি ২৫ টাকা ও এমওপি ১৮ টাকা কেজি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমওপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা, টিএসপি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ডিএপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ইউরিয়া অনেক জায়গায় ৩০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার ও সাব-ডিলার রয়েছেন ১৬২ জন এবং বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলার ১৪১ জন।
বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলার নয়টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় প্রায় দ্বিগুন ২৪ হাজার মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। ইউরিয়ার মজুদও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।
গত জুন মাসে ডিলারদের মধ্যে ২ হাজার ১০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৮০৮ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১২৩ মেট্রিক টন এমওপি বিতরণ করা হয়েছে। জুলাই মাসের জন্যও ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির উল্লেখযোগ্য মজুদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি হিসাবে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের সাব-ডিলারদের দাবি, তারা প্রয়োজনের ২০ শতাংশ সারও পাচ্ছেন না।
সরকার প্রতি কেজি সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে সার ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, সেটি কৃষকদের জন্য ২০ থেকে ২৭ টাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩৫ টাকা, ২১ টাকার ডিএপি ৩০ টাকা, ২০ টাকার এমওপি ৩০ টাকা এবং ২৫ টাকার টিএসপি ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মাঠে গিয়ে সার ও বালাইনাশকের দোকান মনিটরিং করছি। বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী সার বিতরণ করা হয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে কৃষক ও সাব-ডিলারদের দাবি, মনিটরিং কার্যক্রম কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পৌঁছাচ্ছে না।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমন ধানের প্রথম চাষ ও চারা রোপণের সময় প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফলন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। এক বিঘা জমি প্রস্তুতের সময়ই প্রায় ৫০ কেজি সার প্রয়োজন হয়। ফলে বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।


























