শনিবার ২৫ জুলাই ২০২৬

৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনএম খান: যশোরের এক মানবিক কালেক্টর

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৭:৫২, ২৩ জুলাই ২০২৬

এনএম খান: যশোরের এক মানবিক কালেক্টর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে যশোর জেলার প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন আইসিএস কর্মকর্তা নিয়াজ মোহাম্মদ খান, যিনি সংক্ষেপে এনএম খান নামে পরিচিত। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি দক্ষ প্রশাসক, সমাজসেবক এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। যশোরের মানুষ আজও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তার উদ্যোগে যশোর মোমিন নগর তন্তবায় সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। একই সঙ্গে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের গ্রন্থাগারকে টিকিয়ে রাখতে তার অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
নিয়াজ মোহাম্মদ খানের জন্ম ১৯০৭ সালের ৭ জুন বিহারে। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্বর্ণপদকসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩০ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে পাঠানো হয় তাকে। ১৯৩২ সালে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তিনি নিজের ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪২ সালে মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর এবং ১৯৪৫-৪৬ সালে কৃষি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পাকিস্তান আমলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামের কমিশনার হিসেবে একটি স্টেডিয়াম ও পার্ক প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও তার স্মৃতিকে বহন করছে। ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি এবং ১৯৫৬ সালে করাচির চিফ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি স্কাউট আন্দোলনেও ছিল তার অসামান্য অবদান। তিনি পাকিস্তান বয় স্কাউট অ্যাসোসিয়েশনের চিফ কমিশনার ছিলেন, এবং ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড স্কাউট কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ব স্কাউট আন্দোলনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৯ সালে তিনি “ব্রোঞ্জ উলফ” সম্মাননায় ভূষিত হন, যা বিশ্ব স্কাউট সংস্থার সর্বোচ্চ পুরস্কার। সাহিত্যচর্চাতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। পাঞ্জাবি ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদসহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সালের ২১ এপ্রিল লাহোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এনএম খানের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায় ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের কচুয়া বাজারে। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে ১৯৩৭ সালে শিক্ষানুরাগী জমিদার কাজী সরোয়ার উদ্দিন ও চিকিৎসক হাবিবুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় কচুয়া বাজার পাবলিক লাইব্রেরি। বেনীপুর বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করতেই এই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। শুরুতে একটি টিনের ঘরে মাত্র ৩০০টি বই নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। অধিকাংশ বইই ছিল শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই।
১৯৪২ সালে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এনএম খান বেনীপুর বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান। বিদ্যালয় পরিদর্শনের পর তিনি কচুয়া বাজার পাবলিক লাইব্রেরিও ঘুরে দেখেন। প্রত্যন্ত গ্রামে এমন একটি পাঠাগার দেখে তিনি অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন। গ্রন্থাগারের উন্নয়নের জন্য তিনি সে সময় দুই হাজার টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করে দেন। ওই অর্থে নির্মিত হয় গ্রন্থাগারের প্রথম পাকা ভবন। তার সম্মানে স্থানীয় মানুষ গ্রন্থাগারের নাম পরিবর্তন করে রাখেন এনএম খান পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড ভিলেজ হল।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: