বাংলার ইতিহাসে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন এক গভীর ক্ষতের নাম পলাশীর যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল শুধু নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় নয়; এটি ছিল বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এক নতুন যুগের সূচনা। পলাশীর আম্রকাননে যে বিশ্বাসঘাতকতার নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল, তার পরিণতিতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় হতে শুরু করে। এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ, যিনি ইতিহাসে অধিক পরিচিত লর্ড ক্লাইভ নামে।
১৭২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবার্ট ক্লাইভ। জীবনের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। ১৭৪৪ সালে সামান্য কেরানি হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে যোগ দেন এবং একই বছর কোম্পানির বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতে আসেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে এই সাধারণ কর্মচারীই একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রধান কুশীলবে পরিণত হন।
ভারতে কিছুদিন কাজ করার পর ক্লাইভ ইংল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে পুনরায় ভারতে ফিরে আসেন। এই দ্বিতীয় আগমনই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মোড় সৃষ্টি করে। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি নানা ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল অবলম্বন করেন।
এরই পরিণতিতে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকে। মীর জাফর ও তার সহযোগীদের বিশ্বাসঘাতকতা নবাবের পরাজয় নিশ্চিত করে। যুদ্ধ শেষে মীর জাফর নবাবের সিংহাসনে বসলেও প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাংলার স্বাধীনতার অবসান ঘটে এবং শুরু হয় বিদেশি শাসনের দীর্ঘ অধ্যায়।
পলাশীর পর ক্লাইভ শুধু রাজনৈতিক কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠা করেননি; তিনি এমন এক প্রশাসনিক সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তোলেন, যেখানে ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যক্তিস্বার্থ, সম্পদ লুণ্ঠন এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ছিল নিত্যকার বিষয়। বাংলার বিপুল সম্পদ ইংল্যান্ডে প্রবাহিত হতে থাকে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই সম্পদ ব্রিটিশ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর বাংলার অর্থনীতি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৭৬৭ সালে ক্লাইভ ইংল্যান্ডে ফিরে যান। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থেমে থাকেনি। ভারতে অর্জিত বিপুল সম্পদ এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ইংল্যান্ডে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে তাঁর সম্পদ অর্জনের নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
যদিও তিনি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন, তবুও জনমত ও রাজনৈতিক চাপ কমেনি।
অবশেষে ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর রবার্ট ক্লাইভের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, নিজের শরীরে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, অতিরিক্ত আফিম সেবন বা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও তাঁর মৃত্যু হতে পারে। তবে যে কারণেই তাঁর মৃত্যু হোক না কেন, তাঁর নাম ইতিহাসে চিরকাল বিতর্কিত হয়েই রয়ে গেছে।


























