বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬

৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খিচুড়ি বাঙালির আবেগ, ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রা

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৫:০৬, ২২ জুলাই ২০২৬

খিচুড়ি বাঙালির আবেগ, ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রা

বর্ষার দুপুর, কিংবা ঘরোয়া আয়োজন- খিচুড়ি যেন বাঙালির চিরচেনা এক স্বাদের নাম। তবে শুধু একটি খাবার হিসেবেই নয়, খিচুড়ি জড়িয়ে আছে পুরাণ, ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে। যুগে যুগে রাজা-বাদশাহ, সাধক, কবি থেকে সাধারণ মানুষের পাতে সমানভাবে স্থান করে নেওয়া এই খাবারের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ।


মনসামঙ্গল কাব্যে একটি মজার ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে দেবী দুর্গা নন্দি-কে ডাব পেড়ে আনতে বলেন। কারণ, শিবের ইচ্ছা হয়েছিল ডাবের জল দিয়ে রান্না করা মুগের ডালের খিচুড়ি খাওয়ার। কাব্যে খিচুড়িকে বলা হয়েছে বৈসাদৃশ্যময় উপকরণে তৈরি এক মিশ্র খাদ্য। এই উল্লেখ থেকেই বোঝা যায়, বহু শতাব্দী আগে থেকেই খিচুড়ি মানুষের কল্পনা ও খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
খিচুড়ির প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল স্বামী বিবেকানন্দের। তরুণ বয়সে তাঁর ‘পেটুক সঙ্ঘ’ বা ‘গ্রিডি ক্লাব’-এর অন্যতম গবেষণার বিষয় ছিল নতুন ধরনের খিচুড়ি রান্না। পরে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার ভোগ হিসেবে যে খিচুড়ি রান্নার প্রচলন হয়, সেটি ছিল তাঁরই পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও নির্দেশনায়। সেই রেসিপি আজও অনুসরণ করা হয়। সাহিত্যিক শঙ্কর একে ‘বিশ্বের সেরা খিচুড়ি’ বলেই অভিহিত করেছেন। বিবেকানন্দের পরিকল্পিত সেই খিচুড়িতে সমান পরিমাণ চাল, মুগডাল ও সবজি ব্যবহারের রীতি আজও বজায় রয়েছে।


চৈতন্যদেবেরও প্রিয় খাদ্যের তালিকায় ছিল খিচুড়ি। শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন, মুঘল সম্রাট আকবর, হুমায়ূন, জাহাঙ্গীর থেকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত অনেক শাসকের কাছেই মুগডালের খিচুড়ি ছিল জনপ্রিয়। এমনকি পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নৌকায় পালিয়ে যাওয়ার সময়ও সিরাজউদ্দৌলার জন্য খিচুড়ি রান্না করা হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
যদিও খিচুড়িকে বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাবার বলা হয়, এর উৎপত্তি বাংলায় নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশেই চাল ও ডাল মিশিয়ে রান্না করা খাবারের প্রচলন ছিল। গ্রিক দূত সেলুকাস ভারত ভ্রমণের সময় এ ধরনের খাদ্যের জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করেন। আল বেরুনি তাঁর ‘ভারততত্ত্ব’-এ খিচুড়ির কথা লিখেছেন। মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতা বিশেষভাবে মুগডালের খিচুড়ির উল্লেখ করেছেন। চাণক্যের লেখাতেও মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের আমলে এ ধরনের খাবারের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।


সপ্তদশ শতকে ভারতে ভ্রমণকারী ফরাসি পরিব্রাজক জ্যঁ-বাতিস্ত তাভেরনিয়ের লিখেছিলেন, সে সময় ভারতের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই খিচুড়ি রান্নার প্রচলন ছিল। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর খিচুড়ির সঙ্গে পেস্তা ও কিসমিস মিশিয়ে একটি বিশেষ পদ তৈরি করতেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজাঁ’।


খিচুড়ির প্রভাব শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উনিশ শতকের মাঝামাঝি মিশরে ‘কুশারি’ নামে একটি জনপ্রিয় খাবারের প্রচলন ঘটে। চাল, ডাল, ছোলা, ভিনেগার, টমেটো সস, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনসহ নানা উপকরণে তৈরি এই খাবারের সঙ্গে খিচুড়ির ভাবগত মিল রয়েছে।


গবেষকদের ধারণা, ১২০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে খিচুড়ি বাংলায় প্রবেশ করে। এরপর ধীরে ধীরে এটি বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। পূজার ভোগ, বর্ষার দুপুর, পারিবারিক আয়োজন কিংবা অতিথি আপ্যায়ন- সব ক্ষেত্রেই খিচুড়ি আজ সমান জনপ্রিয়। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: