১৭৯৪ সালে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর ছিলেন মি. আর্থার হেসেলরিজ। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চৌগাছা উপজেলার তাহিরপুর গ্রামের কপোতাক্ষ-ভৈরব সঙ্গমস্থল। আজ সেই উদ্যোগ ইতিহাসের পাতায় প্রায় বিস্মৃত হলেও, একসময় এটি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার নদীব্যবস্থা ও নৌ-যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
তাহিরপুর গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে কপোতাক্ষ নদ। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্ত থেকেই কপোতাক্ষের বুক চিরে বের হয়েছে লোয়ার ভৈরব নদ। অর্থাৎ, তাহিরপুর ছিল কপোতাক্ষ ও ভৈরব নদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগমস্থল। এই ভৌগোলিক অবস্থানই আর্থার হেসেলরিজের পরিকল্পনার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সেই সময় কলকাতা থেকে যশোরে আসার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। কিন্তু ভৈরব নদে নাব্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। নদীটিকে সচল ও গভীর রাখতে হেসেলরিজ তাহিরপুরের ওপরের দিকে কপোতাক্ষ নদে একটি বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, কপোতাক্ষের প্রবল স্রোতকে ভৈরব নদে প্রবাহিত করা হলে ভৈরবের পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে। এতে কলকাতা থেকে যশোর পর্যন্ত নৌ-যাতায়াত আরও সহজ ও নিরাপদ হবে।
কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম মানুষের পরিকল্পনাকে সব সময় মেনে নেয় না। বর্ষা মৌসুমে কপোতাক্ষের প্রবল পানির চাপ সেই বাঁধ ভেঙে দেয়। ফলে নদীর মূল স্রোত আবার তার পুরোনো খাত দিয়েই প্রবাহিত হতে শুরু করে। আর্থার হেসেলরিজের প্রকৌশল পরিকল্পনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
এই বাঁধ নির্মাণের ফলে কপোতাক্ষ ও ভৈরব- উভয় নদীরই সাময়িক ক্ষতি হয়েছিল বলে জানা যায়। কপোতাক্ষে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভৈরবেও প্রত্যাশিত সুফল স্থায়ীভাবে পাওয়া যায়নি। নদীর স্বাভাবিক গতি প্রকৃতিতে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ যে কতটা জটিল ফল বয়ে আনতে পারে, তাহিরপুরের এই ঘটনা তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।
বাঁধটি বহু বছর ধরে তাহিরপুরে অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ছিল একদিকে প্রশাসনিক উদ্যোগের স্মারক, অন্যদিকে প্রকৃতির অদম্য শক্তির প্রতীক। সময়ের সঙ্গে বাঁধের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হলেও ইতিহাসে এর গুরুত্ব কমেনি।


























