শুক্রবার ৩১ জুলাই ২০২৬

১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খরা, বন্যা আর দুর্ভিক্ষের যশোর

১৮৬৬ সালের সেই ভয়াল খাদ্যসংকটের ইতিহাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৩৬, ৩০ জুলাই ২০২৬

১৮৬৬ সালের সেই ভয়াল খাদ্যসংকটের ইতিহাস

এক সময়ের যশোর ছিল প্রকৃতির নির্মম পরীক্ষাগারের মতো। বছর ঘুরলেই কখনো প্রলয়ংকরী বন্যা, কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কখনো দুর্ভিক্ষ এসে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলত। কৃষিনির্ভর এই জনপদের মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হতো আকাশের দিকে তাকিয়ে। বর্ষা বেশি হলেও বিপদ, আবার বৃষ্টি কম হলেও বিপদ। নদীমাতৃক যশোরে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।


ঐতিহাসিক দলিলপত্র থেকে জানা যায়, আঠারো ও উনিশ শতকে যশোরে একাধিক বড় বন্যা আঘাত হেনেছিল। ১৭৮৭, ১৭৯০, ১৭৯৮, ১৮৩৮, ১৮৪৭, ১৮৫৭, ১৮৭১, ১৮৮৫ এবং ১৮৯০ সালে ভয়াবহ বন্যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়। পরবর্তী সময়েও বহুবার বন্যা হয়েছে, তবে এই ঘটনাগুলো যশোরের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নদীভাঙন, ফসলের ক্ষতি, গৃহহানি এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ছিল এসব বন্যার নিত্যসঙ্গী। কৃষকের সারা বছরের শ্রম মুহূর্তেই পানির নিচে তলিয়ে যেত।


অন্যদিকে দুর্ভিক্ষও ছিল যশোরের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। ১৭৯১, ১৮৬৬, ১৮৭৪ এবং ১৮৯৭ সালে দুর্ভিক্ষের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষ বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ, এটি মানুষের জীবনযাত্রা, বাজারব্যবস্থা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।


এই দুর্ভিক্ষের পেছনে ছিল প্রকৃতির ধারাবাহিক বিরূপ আচরণ। ১৮৬৫ সালে যশোরে তীব্র খরা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ধানক্ষেত শুকিয়ে যায়, কৃষকের গোলা খালি হতে শুরু করে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে এই ফসলহানি দ্রুত খাদ্যসংকটে রূপ নেয়। বাজারে চালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় এক টাকায় মাত্র ১০ সের চাল পাওয়া যেত। যদিও স্বাভাবিক সময়ে চালের দাম কত ছিল, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সমসাময়িক বিবরণ থেকে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছিল। কৃষক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেক পরিবারকে খাদ্যের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছিল।


প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু খাদ্য সংকটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। 
তবে ইতিহাসের একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮৭৪ সালেও যশোরে দুর্ভিক্ষের কথা জানা যায়, কিন্তু সে সময় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সমসাময়িক বিবরণে দেখা যায়, ওই দুর্ভিক্ষের সময় যশোরে চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং এখান থেকে পাশের জেলা কুষ্টিয়ায় চালসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে যশোরের খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল।


এই পার্থক্যের কারণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। ধারণা করা হয়, কৃষি উৎপাদনের উন্নতি, খাদ্যসংগ্রহ ও সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন, কিংবা প্রশাসনিক উদ্যোগ- এসব কারণে ১৮৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে যশোর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পেরেছিল। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।


যশোরের ইতিহাসে বন্যা, খরা ও দুর্ভিক্ষের ঘটনাগুলো এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রাম, অভিযোজন এবং টিকে থাকার ইতিহাসও বটে। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই যশোরের কৃষকসমাজ বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি, অন্যদিকে কয়েক বছর পরই প্রতিবেশী জেলায় খাদ্য পাঠানোর সক্ষমতা- এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, ইতিহাস কখনো একরৈখিক নয়।
আজকের যশোরে আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং কৃষি প্রযুক্তির কারণে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: