শুক্রবার ০৭ আগস্ট ২০২৬

২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বদেশি আন্দোলনে নতুন উদ্দীপনার সূচনা

১৯০৭ সালের যশোর জেলা কংগ্রেস সম্মেলন

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৫৪, ৬ আগস্ট ২০২৬

১৯০৭ সালের যশোর জেলা কংগ্রেস সম্মেলন

স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ১৯০৭ সালের ২২ ও ২৩ জুন যশোর শহরের হাটখোলা রোডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল অবিভক্ত যশোর জেলার কংগ্রেসের এক ঐতিহাসিক জেলা সম্মেলন। সুসজ্জিত একটি বিশাল টিনের ছাউনির নিচে আয়োজিত এই দুই দিনের সম্মেলনে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি চেতনা এবং জাতীয় শিক্ষার প্রসারে জেলার মানুষের ঐক্যবদ্ধ অঙ্গীকারের এক অনন্য দলিল হয়ে ওঠে।


সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন কলকাতার বিশিষ্ট ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তী ও অমৃতবাজার পত্রিকা-র সম্পাদক মতিলাল ঘোষ। দুই দিনের সম্মেলনে তাঁরা পর্যায়ক্রমে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই ঐতিহাসিক আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই।


১৯০৭ সালের ৩০ মে কেশবপুরের বিদ্যানন্দকাটি ও মঙ্গলকোট এলাকার অধিবাসীরা গ্রামের উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে এক সভায় মিলিত হন। সেখানে জেলার বিশিষ্ট আইনজীবী উমেশচন্দ্র ঘোষ (বড়)-কে মুখপাত্র করে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচিত হয়। একই সময়ে মাগুরা মহকুমা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকেও ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তীকে নেতা করে ৪৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল মনোনীত হয়। ঝিনাইদহ মহকুমায় কেদারনাথ বকসীর সভাপতিত্বে একটি বড় প্রতিনিধি দল গঠিত হয়। নড়াইল থেকেও জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রতিনিধি দল সম্মেলনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সম্মেলনটি ছিল সমগ্র অবিভক্ত যশোর জেলার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।


২২ জুন সকালে কলকাতা থেকে নির্বাচিত সভাপতি ব্যোমকেশ চক্রবর্তী ও মতিলাল ঘোষ ট্রেনে যশোর স্টেশনে পৌঁছালে রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারসহ জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং প্রায় তিন শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক তাঁদের জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানান। বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের অধিবেশন শুরু হয়।
অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি উমেশচন্দ্র ঘোষ (বড়) স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন। এরপর সম্মেলনে জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ছিল— জেলা, মহকুমা ও গ্রাম পর্যায়ে সমিতি প্রতিষ্ঠা, বিলাতি পণ্য বর্জন, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করা, জাতীয় শিক্ষার প্রসার, চরকার ব্যবহার জনপ্রিয় করা এবং কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন।


সভাপতি ব্যোমকেশ চক্রবর্তী তাঁর সুচিন্তিত ভাষণ ইংরেজিতে প্রদান করেন। সেই ভাষণ বাংলায় অনুবাদ করে উপস্থিত জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করেন রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার। ফলে সম্মেলনে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু সহজেই পৌঁছে যায়।


পরদিন ২৩ জুন সকালের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মতিলাল ঘোষ। বিকেলে উমেশচন্দ্র ঘোষের বাসভবনের প্রাঙ্গণে একটি উন্মুক্ত সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে স্বদেশি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ও প্রখ্যাত বাগ্মী বিপিনচন্দ্র পাল এবং মনোরঞ্জন গুহের দীর্ঘ, উদ্দীপনাময় বক্তৃতা উপস্থিত বিরাট জনসমাবেশকে আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
দুই দিনের রাজনৈতিক অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে প্রতাপাদিত্য উৎসব উদযাপনের মধ্য দিয়ে। নানা ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবটি পালন করা হয়, যা সম্মেলনের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর সমন্বয় ঘটায়।


ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯০৭ সালের এই যশোর জেলা কংগ্রেস সম্মেলন ছিল স্বদেশি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জেলার বিভিন্ন মহকুমা ও গ্রাম থেকে আগত প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের জোরালো আহ্বান যশোর অঞ্চলে স্বদেশি আন্দোলনের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সেই সময়ে এই সম্মেলন যশোরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: