সামনে শত্রু। ডানে-বামেও শত্রুর অবস্থান। চারদিকে মৃত্যুর হাতছানি। মনে হয়, মৃত্যু যেন দু’হাত বাড়িয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করতে চায়। অথচ তিনি অবিচল। এক হাতে রাইফেল, অন্য হাতে ক্যামেরা। একদিকে শত্রুর দিকে ছুড়ছেন গুলি, অন্যদিকে ক্যামেরার শাটার টিপে ধরে রাখছেন যুদ্ধের একেকটি মুহূর্ত।
এভাবেই একাত্তরের নয় মাস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়েছেন এবং ছবি তুলেছেন মো. সফি। তাঁর ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য দৃশ্য। রণাঙ্গনের সেই ছবিগুলো শুধু বাংলাদেশের মানুষ দেখেনি; ছাপা হয়েছে ভারতের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের কথা জানতে পেরেছে বিশ্ববাসী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে বিশ্বজনমত। জেগে উঠেছে বিশ্ব বিবেক।
একাত্তরের সেই সাহসী মানুষ মো. সফি। জন্ম ১৯৩৪ সালের ১০ আগস্ট। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর মৃত্যুও ১০ আগস্ট- ১৯৯৭ সালের এই দিনে। তাঁর পিতা দলিল উদ্দিন চাইতেন ছেলে লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করুক। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি সফির তেমন আগ্রহ ছিল না। তাঁর নেশা ছিল ছবি তোলা। ছবি তোলাই ছিল তাঁর আনন্দ, তাঁর ভালোবাসা।
মাত্র ১২ বছর বয়সে, ১৯৪৬ সালে কলকাতা থেকে একটি পুরোনো ক্যামেরা কিনেছিলেন তিনি। সেই ক্যামেরা দিয়ে রিলের পর রিল ছবি তুলতেন। ছেলের লেখাপড়ার প্রতি অনাগ্রহে বাবা তাঁকে বকাঝকা করতেন। কিন্তু ছবি তোলার নেশা থেকে তাঁকে ফেরানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাবার বকুনি থেকে বাঁচতে ১৯৫০ সালে বাড়ি ছেড়ে চলে যান দার্জিলিংয়ে।
দার্জিলিংয়ে গিয়ে শুরু হয় তাঁর পেশাদারি আলোকচিত্র জীবনের নতুন অধ্যায়। চা-বাগানের শ্রমিকদের পরিচয়পত্রের জন্য ছবি তোলার কাজ করতেন তিনি। ক্যামেরাকে তখন আর নিছক শখ হিসেবে দেখেননি; ছবি তোলাই হয়ে ওঠে তাঁর পেশা। প্রায় দুই বছর দার্জিলিং থাকার পর চলে আসেন রংপুরে, বোনের বাসায়। সেখানে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁর আলোকচিত্রের জগৎকে আরও বিস্তৃত করে।
রংপুরে তিনি ‘রেটিনা’ নামে একটি ফটো স্টুডিও চালু করেন। পরে ১৯৬২ সালে ফিরে আসেন যশোরে। শহরের তসবির মহলের সামনে একটি ফটো তোলার দোকান দেন। এরপর শহরের চৌরাস্তায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফটো ফ্লাস’। পরে সেটি ছেড়ে রেল রোডে ‘ফটো ফোকাস’ নামে আরেকটি স্টুডিও গড়ে তোলেন।
ততদিনে যশোর শহরে তিনি পরিচিত মুখ। সবার কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘সফি ভাই’। কিন্তু সফির ক্যামেরা শুধু স্টুডিও’র চার দেয়ালে আটকে ছিল না। রাজনীতি ও গণআন্দোলনের উত্তাল সময় তাঁকে টেনে নিয়েছিল রাজপথে। ১৯৫৪ সাল থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশ ও রাজনৈতিক নেতাদের ছবি তুলতে শুরু করেন তিনি। যশোরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এলে তাঁর ক্যামেরা সচল হয়ে উঠত। রাজনৈতিক সভা, জনসমাবেশ, নেতাদের বক্তব্য- সবকিছুই তিনি ক্যামেরায় ধরে রাখতেন। ক্যামেরার প্রতি এই গভীর ভালোবাসাই একাত্তরে তাঁকে নিয়ে যায় যুদ্ধের ময়দানে।
১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ যশোর শহর ত্যাগ করেন মো. সফি। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁর টালিখোলা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। এবার তিনি শুধু আলোকচিত্রী নন- একজন মুক্তিযোদ্ধা। রাইফেল আর ক্যামেরা- দুটি অস্ত্র নিয়েই শুরু হয় তাঁর যুদ্ধ।
যশোরের খাজুরা, বয়রা, গোগা এবং খুলনার শিরোমণি এলাকার বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর অবস্থান ছিল অন্যদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। একজন যোদ্ধা হিসেবে শত্রুর বিরুদ্ধে গুলি ছুড়েছেন, আবার একজন আলোকচিত্রী হিসেবে সেই যুদ্ধের ইতিহাস ধরে রেখেছেন ক্যামেরায়। একদিকে জীবন বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব।
ছবি তুলতে গিয়ে বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। শত্রুর গুলি ছুটে এসেছে, চারপাশে ছিল ভয়াবহ বিপদ। কিন্তু প্রতিবারই যেন ভাগ্য তাঁকে রক্ষা করেছে। শত্রুর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছেন তিনি। আবার ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়েছেন যুদ্ধের মধ্যে।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে মো. সফি প্রায় পাঁচশ ছবি তুলেছিলেন বলে জানা যায়। তবে তাঁর তোলা সব ছবি তাঁর নিজের সংগ্রহে থাকেনি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছবি তোলার পর তিনি অনেক সময় রিল পাঠিয়ে দিতেন ভারতীয় সাংবাদিকদের কাছে। সেসব রিল থেকে ছবি প্রকাশিত হতো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। যুদ্ধের ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার কারণে অনেক রিল আর তাঁর কাছে ফিরে আসেনি। তবুও তাঁর ক্যামেরার ছবি থেমে থাকেনি। বরং সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বে।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, অমৃতবাজার পত্রিকা, ইকোনমিক টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে তাঁর তোলা ছবি প্রকাশিত হয়েছে। শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকাতেও তাঁর আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পাঠকদের সামনে পৌঁছে যায়। একটি ছবি তখন হয়ে উঠেছিল একটি দেশের পক্ষে কথা বলার শক্তিশালী মাধ্যম।
কোনো ছবিতে হয়ত দেখা গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি, কোথাও রণাঙ্গনের দৃশ্য, কোথাও সাধারণ মানুষের দুর্দশা। এসব ছবির মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে- বাংলাদেশের মানুষ কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়ছে।
ছবির ভাষা ছিল আন্তর্জাতিক। এর জন্য কোনো অনুবাদের প্রয়োজন হয়নি। একটি রক্তাক্ত মুখ, একটি বিধ্বস্ত জনপদ, অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কিংবা যুদ্ধের মধ্যে মানুষের অসহায়ত্ব- এসব দৃশ্যই বিশ্ববাসীর কাছে একাত্তরের বাস্তবতা তুলে ধরেছিল।
মো. সফির ক্যামেরার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। তিনি নিজেই ছিলেন যুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী। যে হাতে ক্যামেরা, সেই হাতেই ছিল রাইফেল।
আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় তাঁর তোলা ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যশোরের গৌরবাঙ্গণসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। জীবদ্দশায় ঢাকা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর তোলা ছবির প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক যুদ্ধস্মৃতি মুছে যায়। অনেক যোদ্ধা চলে যান, অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি হারিয়ে যায়। কিন্তু একটি ছবি থেকে যায়। সেই ছবি হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী। মো. সফির তোলা ছবিগুলোর মূল্য তাই অনেক বেশি।
সফির জীবনটিও যেন তাঁর ক্যামেরার মতোই এক দীর্ঘ যাত্রা- শৈশবের পুরোনো ক্যামেরা থেকে দার্জিলিংয়ের চা-বাগান, রংপুরের স্টুডিও, যশোরের ফটো ফ্লাস ও ফটো ফোকাস, রাজনৈতিক আন্দোলনের রাজপথ, তারপর একাত্তরের রণাঙ্গন। শেষ পর্যন্ত সেই ক্যামেরাই তাঁকে ইতিহাসের অংশ করে দিয়েছে।
১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট তাঁর জীবন থেমে যায়। কিন্তু তাঁর ক্যামেরায় বন্দি একাত্তর থামেনি। আজও সেই ছবিগুলো কথা বলে। বলে একটি জাতির স্বাধীনতার কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসের কথা, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের কথা। বলে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথাও।
একাত্তরে মো. সফির সামনে ছিল মৃত্যু। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। এক হাতে রাইফেল, অন্য হাতে ক্যামেরা নিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সামনে।
রাইফেলের গুলি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিল; আর ক্যামেরার ক্লিক লড়েছিল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে।


























