উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার মফস্বল জনপদের জীবন কেমন ছিল, তার একটি মূল্যবান দলিল পাওয়া যায় ব্রিটিশ আমলের সিভিল সার্ভেন্ট হেনরি কটনের স্মৃতিকথায়। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর বাংলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন কাজ করেছিলেন তিনি। তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে নদীয়া জেলার চুয়াডাঙ্গায়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি জেলা। চুয়াডাঙ্গায় তাঁর তিন বছরের অবস্থানকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন ভয়াবহ বন্যা এবং অংশ নিয়েছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরকারি জনগণনা কার্যক্রমে।
১৮৬৭ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ভারতে আসেন হেনরি কটন। মেদিনীপুরে প্রথম কর্মজীবন শুরুর পর তাঁকে বদলি করা হয় নদীয়া জেলার চুয়াডাঙ্গায়। সময়টা ১৮৬৯ সালের কাছাকাছি। গ্রামবাংলার এই জনপদে এসে একজন ব্রিটিশ প্রশাসকের সামনে খুলে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমাজের ছবি- যেখানে মানুষের জীবন, শিক্ষা, পেশা, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থানের মধ্যে ছিল গভীর বৈচিত্র্য।
চুয়াডাঙ্গায় তাঁর কর্মজীবনের শুরুতেই বড় পরীক্ষা হয়ে আসে ১৮৭১ সালের ভয়াবহ বন্যা। নদী-নালা ও জলাভূমিতে ঘেরা এই অঞ্চলের মানুষের জীবন তখন অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল প্রকৃতির ওপর। অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কটনকে সেই দুর্যোগের মধ্যেই সামলাতে হয়েছিল জনজীবনের নানা সমস্যা। তাঁর স্মৃতিচারণে সেই সময়ের চুয়াডাঙ্গার বাস্তবতা ও মানুষের জীবনযাত্রার নানা দিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে চুয়াডাঙ্গা পর্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল জনগণনা। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ ভারতজুড়ে জনগণনা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই বৃহৎ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে হেনরি কটনও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শুধু মানুষ গুনেই তিনি থেমে থাকেননি। নিজের আগ্রহে জনগণনার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন একটি ‘এডুকেশনাল সেন্সাস’ বা শিক্ষাবিষয়ক গণনাও। ফলে চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন সমাজে শিক্ষা কতটা বিস্তৃত ছিল, কোন শ্রেণি বা পেশার মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার কেমন ছিল- তার কিছু দুর্লভ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তাঁর নথি ও স্মৃতিচারণ থেকে।
সেই পরিসংখ্যান আজকের পাঠকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কটনের হিসাব অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গার সমগ্র জনগোষ্ঠীর মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ লিখতে ও পড়তে জানতেন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে শিক্ষিতের হার ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
নারীদের শিক্ষার অবস্থা ছিল আরও করুণ। তাঁর নথিতে স্বল্পশিক্ষিত নারীর সংখ্যা মাত্র পাঁচজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- যার মধ্যে চারজন ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং একজন মুসলমান।
মুসলমান সমাজের শিক্ষার চিত্রও ছিল অত্যন্ত সীমিত। ফারসি বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত মুসলমানের সংখ্যা পাওয়া যায় মাত্র দুজন। বাংলায় লিখতে ও পড়তে জানতেন এমন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান পুরুষের হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে হিন্দু সমাজের মধ্যে শিক্ষার বিস্তারে শ্রেণিভেদ স্পষ্ট ছিল। বাংলায় লিখতে ও পড়তে জানা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের হার ব্রাহ্মণদের মধ্যে ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ এবং কায়স্থদের মধ্যে ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ। বৈশ্যদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
কিন্তু পেশাভিত্তিক সমাজের নিচের দিকে নামলে শিক্ষার চিত্র দ্রুত বদলে যায়। ছোট দোকানদার ও কারিগরদের মধ্যে শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। কৃষকদের মধ্যে ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং জেলেদের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ লিখতে-পড়তে জানতেন।
এই পরিসংখ্যান শুধু শিক্ষার হারই জানায় না; উনিশ শতকের চুয়াডাঙ্গার সামাজিক কাঠামোর একটি স্পষ্ট ছবিও সামনে আনে। জন্ম, জাতি, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ কীভাবে যুক্ত ছিল, তার একটি প্রাথমিক পরিসংখ্যানগত দলিল হয়ে আছে কটনের এই ‘এডুকেশনাল সেন্সাস’।
আরও একটি বিষয় চুয়াডাঙ্গা পর্বকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। হেনরি কটন নিজেই বাংলা ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি বাংলা ও ফারসি পড়তে এবং লিখতে পারতেন। চুয়াডাঙ্গায় সাব-ডিভিশনের দায়িত্বে থাকার দুই বছরের মধ্যে দফতরের প্রায় সমস্ত কাজ বাংলায় করার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। শুধু সরকারি চিঠিপত্রের আদান-প্রদান ছাড়া অফিসের অন্যান্য কাজে তিনি বাংলা ভাষাই ব্যবহার করতেন। একজন ঔপনিবেশিক প্রশাসকের এই ভাষাজ্ঞান এবং স্থানীয় ভাষায় প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার অভ্যাস সে সময়ের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।
চুয়াডাঙ্গায় কাটানো তিন বছর তাই হেনরি কটনের কর্মজীবনের একটি সাধারণ বদলির অধ্যায় ছিল না। বন্যার দুর্যোগ, গ্রামীণ মানুষের জীবন, জনগণনার কাজ এবং শিক্ষার পরিসংখ্যান সব মিলিয়ে তাঁর স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়েছে উনিশ শতকের চুয়াডাঙ্গার সমাজজীবনের একটি বিরল ছবি।
আজকের চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রায় দেড়শ বছর পেছনে তাকালে সেই পরিসংখ্যান আমাদের শুধু একটি পুরোনো জেলার শিক্ষার হার জানায় না; জানায় তখনকার বাংলার গ্রামসমাজ কতটা অশিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য ও সীমিত সুযোগের মধ্যে জীবন কাটাত। একই সঙ্গে হেনরি কটনের উদ্যোগে সংরক্ষিত সেই তথ্য ইতিহাসের গবেষকদের হাতে তুলে দেয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলার গ্রামাঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার কীভাবে এবং কত ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছিল?
চুয়াডাঙ্গার মাটিতে দায়িত্ব পালন করতে এসে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা যে তথ্য লিখে রেখে গিয়েছিলেন, দেড় শতাব্দী পর তা হয়ে উঠেছে এই জনপদের সামাজিক ইতিহাসের এক মূল্যবান জানালা।


























