দোলযাত্রার দিন। ১৩ মার্চ ১৯২২। বাংলা ১৩২৮ সালের ২৯ ফাল্গুন। কলকাতার সংবাদপত্রের জগতে সেদিন আত্মপ্রকাশ করেছিল একটি নতুন দৈনিক—‘আনন্দবাজার পত্রিকা’। মূল্য মাত্র দু’পয়সা। প্রকাশনা শুরু হয়েছিল সান্ধ্য দৈনিক হিসেবে। কিন্তু সেই ছোট্ট সূচনাই যে একদিন বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের জন্ম দেবে, তা হয়ত প্রথম সংখ্যার পাঠকরাও পুরোপুরি অনুমান করতে পারেননি।
প্রথম সংখ্যাটি ছাপা হয়েছিল ৭১/১, মির্জাপুর স্ট্রিটের শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস থেকে। প্রেসটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুরেশচন্দ্র মজুমদার। আর প্রথম সংখ্যার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল- পুরো পত্রিকাটিই ছাপা হয়েছিল লাল কালিতে। সেই সময় ব্রিটিশ শাসনের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘ইংলিশম্যান’ এই লাল অক্ষরকে দেখেছিল এক ধরনের ‘বিপদ সংকেত’ হিসেবে। ইতিহাসের বিচারে সেই আশঙ্কা একেবারে অমূলক ছিল না। কারণ, পরবর্তী সময়ে আনন্দবাজার পত্রিকা ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
পত্রিকাটির যাত্রা অবশ্য শুরু থেকেই শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসনের কঠিন বাস্তবতায় সংবাদপত্র ছিল মতপ্রকাশ, প্রতিবাদ এবং জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আনন্দবাজারও সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাপের মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়। নির্ভীক সাংবাদিকতা, আপোশহীন মনোভাব এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা তাকে দ্রুতই আলাদা পরিচিতি দেয়।
১৯২৩ সালের ১ জুন থেকে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয় সকালে। এর ফলে পত্রিকাটি আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে তার বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি, প্রযুক্তি ও পরিসর, কিন্তু সংবাদপত্র হিসেবে তার নিজস্ব চরিত্রটি থেকে যায় অটুট।
স্বাধীনতার আগে আনন্দবাজার ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম মুখপাত্র। স্বাধীনতার পরে তার ভূমিকার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নানা প্রশ্নে পত্রিকাটি অবস্থান নিতে থাকে। পক্ষপাতহীন মতামত, গঠনমূলক সমালোচনা, সাহসী সাংবাদিকতা এবং আপোশহীন মনোভাব- এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ধীরে ধীরে তাকে বাংলা সংবাদপত্রের জগতে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।
১৯৫৪ সালে প্রেস কমিশন আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেশের একক সংস্করণের সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র হিসেবে ঘোষণা করে।
একটি সংবাদপত্রের ইতিহাস তার সম্পাদকদের ইতিহাসও বটে। আনন্দবাজারের দীর্ঘ পথচলায় একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রফুল্লকুমার সরকার ছিলেন সম্পাদকীয় নেতৃত্বের প্রথমদিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ১৯২২ সালের ১ জুন থেকে ১৯২৩ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, মাখনলাল সেন, বঙ্কিমচন্দ্র সেনসহ একাধিক সম্পাদক বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেন। সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার দুই দফায় দীর্ঘ সময় সম্পাদক ছিলেন।
১৯৪৪ সালে আবার সম্পাদনার দায়িত্বে আসেন প্রফুল্লকুমার সরকার। এরপর চপলাকান্ত ভট্টাচার্য দুই দফায় গুরুত্বপূর্ণ সময় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নলিনীকিশোর গুহও স্বল্প সময়ের জন্য এই দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অশোক কুমার সরকারের দীর্ঘ সম্পাদকীয় অধ্যায় আনন্দবাজারের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পরে অভীক সরকার ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত সম্পাদক ছিলেন। এরপর অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় এবং ২০২০ সালের ১ জুন থেকে ঈশানী দত্তরায় সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন।
এই দীর্ঘ সম্পাদকীয় উত্তরাধিকার দেখলেই বোঝা যায়, আনন্দবাজারের বাংলা সাংবাদিকতারও একটি দীর্ঘ বিবর্তনের দলিল।
সময়ের সঙ্গে সংবাদপত্রের ভাষাও বদলায়। আনন্দবাজার পত্রিকার ক্ষেত্রে ভাষা ও বানান নিয়ে একটি নিজস্ব নীতিও গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ বাংলা শব্দের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কর্তৃক সংস্কারকৃত বানানবিধি অনুসরণ করা হয়। তবে অবঙ্গভাষী ব্যক্তির নাম এবং বাংলার বাইরের স্থান নামের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাতৃভাষা কিংবা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে প্রচলিত বানান ও উচ্চারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি নাম ও ভাষার যথাযথ উচ্চারণ এবং প্রতিবর্ণীকরণের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করা হয়।
আজ আনন্দবাজার পত্রিকা কলকাতা ছাড়াও নয়াদিল্লি, ভুবনেশ্বর, রাঁচি, শিলিগুড়ি এবং ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে এর প্রকাশনা ও প্রচার বিস্তৃত হয়েছে। প্রকাশ সংখ্যার বিচারে এটি ভারতের বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিকগুলোর অন্যতম। ইন্ডিয়ান রিডারশিপ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, পত্রিকাটির পাঠকসংখ্যাও বিপুল—প্রায় ১৫৬ লাখ।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একটি সংবাদপত্রের টিকে থাকা নিছক ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভাষার ইতিহাস, একটি সমাজের পরিবর্তন, মানুষের চিন্তাভাবনার বিবর্তন এবং সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক অভিঘাত। ১৯২২ সালের সেই দু’পয়সার লাল কালির সান্ধ্য দৈনিক থেকে আজকের বহুমাত্রিক সংবাদমাধ্যম- আনন্দবাজার পত্রিকার পথচলা তাই আসলে বাংলা সাংবাদিকতারই এক দীর্ঘ যাত্রাপথ।
প্রথম সংখ্যার লাল কালিকে ব্রিটিশ শাসনের মুখপত্র যে ‘বিপদ সংকেত’ হিসেবে দেখেছিল, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে ফিরে তাকালে সেই সংকেতের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আনন্দবাজার পত্রিকার ইতিহাস সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।


























