কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামে পা রাখলেই যেন ফিরে যাওয়া যায় বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। এই গ্রামেই মামার বাড়িতে জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন। বুধবার, ১২ আগস্ট, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত লাহিনীপাড়ায় গিয়ে ঘুরে দেখা গেল মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র। নিভৃত গ্রামের এই স্মৃতিকেন্দ্র যেন এখনো ধারণ করে আছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান এই লেখকের জীবন, সাহিত্য ও সৃষ্টির স্মৃতি।
মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামে, তাঁর মামার বাড়িতে। তাঁর পিতা মীর মোয়াজ্জেম হোসেনের পৈতৃক নিবাস ছিল রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী গ্রামে। তাঁর পূর্বপুরুষ সৈয়দ সাদুল্লাহ বাগদাদ থেকে দিল্লি হয়ে ফরিদপুরের স্যাকরা গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে এই পরিবার পদমদীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
মীর মশাররফ হোসেনের শৈশব, শিক্ষা ও সাহিত্যজীবনের সঙ্গে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও কৃষ্ণনগরের নানা স্থান জড়িয়ে আছে। নিজ গৃহ থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি লিখেছেন নিরলসভাবে। গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ, নাটক ও উপন্যাস- সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখাতেই তাঁর বিচরণ ছিল। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩৭টি। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সমাজ ও জীবনকে সাহিত্যের বিষয় করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তবে মীর মশাররফ হোসেনকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছে তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’। কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাসকে অবলম্বন করে রচিত এই গ্রন্থ বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি। করুণ পরিণতি, মানবিক বেদনা, বিশ্বাস, ত্যাগ, ভালোবাসা ও আত্মমর্যাদার গভীর অনুভব ‘বিষাদ সিন্ধু’কে শুধু একটি ঐতিহাসিক কাহিনি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি, এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক স্থায়ী সম্পদ।
‘বিষাদ সিন্ধু’র ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি ও আবেগময় উপস্থাপনা পাঠককে কাহিনির গভীরে টেনে নেয়। কারবালার ঘটনা অবলম্বনে লেখা হলেও মীর মশাররফ হোসেন তাঁর সাহিত্যিক শক্তিতে ইতিহাসের বেদনাকে মানবিক বেদনায় রূপ দিয়েছেন। ফলে যুগের পর যুগ ধরে এই গ্রন্থ পাঠকের কাছে আবেদন তৈরি করে চলেছে। বিশেষ করে বাংলার মুসলিম সমাজে ‘বিষাদ সিন্ধু’র পাঠ ও গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গভীর। অনেক পরিবারে এটি ধর্মীয় আবেগ ও সাহিত্যিক অনুরাগ- দুইয়ের সমন্বিত পাঠ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে আছে।
মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যকর্মের পরিসর ছিল বিস্তৃত। সমাজবাস্তবতা, জমিদারি শোষণ, ধর্মীয় অনুভূতি, মানবিক সম্পর্ক এবং সমকালীন জীবন তাঁর লেখায় নানা মাত্রায় উঠে এসেছে। তাঁর ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক তাঁকে তৎকালীন সময়ে শ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন বাংলা গদ্য দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং সমাজের নানা শ্রেণি ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা সাহিত্যে জায়গা করে নিচ্ছে। সেই পরিবর্তনের যুগে মীর মশাররফ হোসেন নিজের স্বতন্ত্র ভাষা ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেন।
তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার আজও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় মুসলিম সমাজের জীবন, ইতিহাস ও অনুভূতিকে শক্তিশালী সাহিত্যিক প্রকাশ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাজবাড়ীর পদমদীতে নিজ গৃহে মৃত্যুবরণ করেন মীর মশাররফ হোসেন। তাঁকে তাঁর স্ত্রী কুলসুমের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর সাহিত্য তাঁকে বাঙালির পাঠকসমাজে জীবন্ত রেখেছে।
এই সাহিত্যিক স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে লাহিনীপাড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র। ২০০১ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় দুই একর জায়গার ওপর আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি ২০০৫ সালে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
স্মৃতিকেন্দ্রটিতে রয়েছে সংগ্রহশালা, ১০০ আসনবিশিষ্ট সেমিনার কক্ষ, দফতর, গ্রন্থাগার, অতিথিকক্ষ, অভ্যর্থনা কক্ষ, ডাইনিং ও কিচেনসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অবকাঠামো। সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- কারণ মীর মশাররফ হোসেনের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী পাঠক, গবেষক ও দর্শনার্থীদের জন্য এগুলো স্মৃতির সঙ্গে জ্ঞানচর্চারও একটি জায়গা তৈরি করেছে।
লাহিনীপাড়ার এই স্মৃতিকেন্দ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি স্মৃতি ভূমি। যে বাড়িতে একদিন জন্ম নিয়েছিলেন ‘বিষাদ সিন্ধু’র স্রষ্টা, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর সাহিত্যকে নতুন করে স্মরণ করার অনুভূতি নিঃসন্দেহে অন্যরকম।
আজকের পাঠক যখন ‘বিষাদ সিন্ধু’র পাতায় কারবালার বেদনা পড়েন, তখন হয়ত তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহু দূরের এক ইতিহাস। কিন্তু সেই অমর বেদনার ভাষাশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন জন্মেছিলেন বাংলারই মাটিতে- কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায়।
দর্শনার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র শুক্রবার ও শনিবারসহ সব ধরনের সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। ফলে ভ্রমণের আগে খোলার দিন ও সময় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া প্রয়োজন।


























