সোমবার ১৭ আগস্ট ২০২৬

১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বল্পায়ু সুকান্তের দীর্ঘ ছায়া রবীন্দ্রনাথ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:২০, ১৭ আগস্ট ২০২৬

স্বল্পায়ু সুকান্তের দীর্ঘ ছায়া রবীন্দ্রনাথ

বাংলা সাহিত্যে কিছু কবি আসেন ধূমকেতুর মতো-স্বল্প সময়ের জন্য আকাশ আলোকিত করে চলে যান, কিন্তু তাঁদের আলো থেকে যায় বহুদিন। সুকান্ত ভট্টাচার্য তেমনই এক কবি। মাত্র একুশ বছরের জীবনে তিনি বাংলা কবিতায় যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজও অম্লান। ঝড়ের গতিতে এসেছিলেন, খানিক সোচ্চার কণ্ঠে কথা বলেছিলেন, আর তাঁর কবিতার কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছিল সমাজের প্রতারিত, শোষিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষ।


তিনি লিখেছিলেন- ‘এই হেমন্তে ফসলেরা বলেঃ কোথায় আপন জন?/ তারা কি কেবল লুকোনো থাকবে,/ অক্ষমতার গ্লানিকে ঢাকবে,/ প্রাণের বদলে যারা প্রতিবাদ করছে উচ্চারণ/ এই নবান্নে প্রতারিতদের হবে না নিমন্ত্রণ?’
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই যেন ধরা পড়ে সুকান্তের কবিসত্তার মূল সুর। মানুষের ক্ষুধা, দুঃখ, অপমান, শোষণ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই তাঁর কবিতার প্রাণ। তিনি ছিলেন মার্কসবাদী চেতনায় বিশ্বাসী, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ এক তরুণ কবি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই বিপ্লবী কবির অন্তর্জগতে গভীর ও অবিচ্ছেদ্যভাবে উপস্থিত ছিলেন আরেক মহাকবি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।


সুকান্তের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক বিশাল জীবনবোধের নাম। ঠিক যেন সদ্য জন্মানো একটি চারা তার শিকড়ের গভীরতা খুঁজে নিচ্ছে শতবর্ষী বটবৃক্ষের ছায়ায়। সুকান্তের সাহিত্যজীবন যতই এগিয়েছে, ততই কোনো না কোনোভাবে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।


রাজনৈতিক মতাদর্শের জায়গায় তাঁদের অবস্থান এক ছিল না। রবীন্দ্রনাথ মার্কসবাদী ছিলেন না; আর সুকান্ত ছিলেন মার্কসবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা এবং মানবমুক্তির স্বপ্ন-এই জায়গাগুলোতে দুই কবির মধ্যে এক গভীর অন্তঃসলিলা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি সুকান্তের আকর্ষণ কতটা গভীর ছিল, তার প্রমাণ তাঁর নিজেরই উচ্চারণ- ‘আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ,
আর একবার তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের।’


এ যেন এক তরুণ কবির আকুল প্রার্থনা। একজন কবি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর প্রয়োজন ফুরোয়নি। বরং সময় যত কঠিন হয়েছে, রবীন্দ্রনাথকে তত বেশি প্রয়োজন হয়েছে সুকান্তের।
১৯৪১ সালে কলকাতা রেডিওর ‘গল্পদাদুর আসর’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন সুকান্ত। সেখানে প্রথমদিকে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ করেন। এরপর রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর একই অনুষ্ঠানে নিজের কবিতা পাঠ করেন তিনি- যে কবিতার কেন্দ্রেও ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই ঘটনাই যেন বলে দেয়, সুকান্তের সাহিত্যিক চেতনায় রবীন্দ্রনাথ কত গভীরভাবে প্রোথিত ছিলেন।


তখন পৃথিবী অস্থির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। কলকাতার আকাশে জাপানি বোমার আতঙ্ক। বাংলার মাটিতে দুর্ভিক্ষের ছায়া। মানুষের ঘরে খাদ্য নেই, পথে মানুষের হাহাকার। ক্ষুধা, মৃত্যু আর যুদ্ধের বিভীষিকা চারপাশে। আর সেই সময়েই যক্ষ্মায় আক্রান্ত সুকান্ত নিজেও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।


একদিকে নিজের শরীরের ভেতরে মৃত্যু, অন্যদিকে সমাজের চারপাশে মৃত্যুর মিছিল। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। তাঁর কবিতা তখন আরও তীব্র, আরও প্রতিবাদী। এই লড়াইয়ের মানসিক শক্তির একটি বড় উৎস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ তখন আর জীবিত নন। কিন্তু তাঁর গান, কবিতা ও সাহিত্যকর্ম যেন জীবন্ত এক সঙ্গী হয়ে সুকান্তের পাশে ছিল। সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে মানবিক শক্তি রবীন্দ্রসাহিত্যে ছড়িয়ে আছে, সুকান্ত সেই শক্তি নিজের মতো করে গ্রহণ করেছিলেন।


তাই তিনি লিখেছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’। সেখানে রবীন্দ্রনাথ কেবল স্মৃতির কবি নন; তিনি হয়ে উঠেছেন সংগ্রামের প্রেরণা। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তরুণ সুকান্ত যেন তাঁর প্রিয় মহাকবির কাছ থেকে সাহস ধার করছেন।
এখানেই সুকান্ত ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের সবচেয়ে আশ্চর্য দিকটি। একজনের জীবন দীর্ঘ, অন্যজনের জীবন ক্ষণস্থায়ী। একজন ছিলেন বিশ্বকবি, অন্যজন তখনও বাংলা সাহিত্যে নিজের আসন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করার আগেই চলে গেলেন। একজনের সামনে ছিল দীর্ঘ সৃষ্টির সময়, অন্যজনের হাতে ছিল মাত্র কয়েকটি বছর। তবু সেই স্বল্পায়ু কবি তাঁর অল্প সময়ের মধ্যেই এমন এক কাব্যভাষা নির্মাণ করলেন, যা আজও তরুণদের হৃদয়ে আগুন জ্বালায়।
সুকান্তের কবিতায় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ আছে, শ্রমিকের ঘাম আছে, কৃষকের বেদনা আছে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছে। আছে একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের মধ্যেও মানবিকতার যে আলো, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দূরত্ব খুব বেশি নয়।


রবীন্দ্রনাথ মানুষকে দেখেছিলেন বৃহত্তর মানবতার আলোয়। সুকান্ত দেখেছিলেন শোষিত মানুষের জীবনসংগ্রামের ভেতর দিয়ে। পথ আলাদা হলেও গন্তব্যে ছিল মানুষের মুক্তি।
এই কারণেই মার্কসবাদী সুকান্তের কাছে রবীন্দ্রনাথ কখনো পুরোনো হয়ে যাননি। বরং কঠিন সময় যত ঘনিয়ে এসেছে, রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজন তাঁর কাছে তত বেড়েছে। যেন মৃত্যুপথযাত্রী তরুণ কবি জীবনের শেষ প্রহরেও খুঁজে নিয়েছেন এক দীর্ঘজীবী কবির হাত।


সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯৪৭ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে চলে গেলেন। জীবন তাঁকে সময় দেয়নি। বাংলা সাহিত্যও তাঁকে বেশি দিন কাছে পায়নি। কিন্তু তাঁর কবিতা তাঁকে অমর করে রেখেছে।
আর তাঁর সেই অমরতার গল্পে রবীন্দ্রনাথও অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছেন।
একজন ছিলেন দীর্ঘজীবী মহাকবি, অন্যজন স্বল্পায়ু বিপ্লবী কবি। একজনের হাতে ছিল শত সৃষ্টির সময়, অন্যজনের হাতে ছিল অল্প কয়েকটি বছর। তবু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁদের সম্পর্ক যেন এক গভীর নদীর দুই তীর- দূরে থেকেও পরস্পরের দিকে অবিরাম তাকিয়ে থাকা।


সুকান্তের কবিতায় তাই রবীন্দ্রনাথ কখনো স্মৃতি, কখনো আশ্রয়, কখনো প্রেরণা, আবার কখনো সংগ্রামের সহযোদ্ধা। স্বল্পায়ু সুকান্ত যখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনও তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘায়ু রবীন্দ্রনাথ- শরীরে নয়, সৃষ্টিতে; জীবনে নয়, চেতনায়। সেই কারণেই হয়ত সুকান্তের কবিতা আজও আমাদের কানে বলে যায়- অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, মানুষের পাশে থাকতে হবে, আর অন্ধকারের মধ্যেও ভবিষ্যতের আলো খুঁজে নিতে হবে।
কারণ, কবির জীবন ফুরিয়ে যায়- কিন্তু কবিতার জীবন ফুরোয় না। আর সত্যিকারের কবিরা চলে গেলেও তাঁদের প্রেরণা থেকে যায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে, ঠিক যেমন সুকান্তের হাতে থেকে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: