নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার আবুল হাসান সবুজ। মাত্র তিনটি গরু ও ১০টি ছাগল নিয়ে শুরু করা উদ্যোগ এখন ২৯টি গাভী, দুধ উৎপাদন, ঘি, মাছ, ফল, সবজি, হাঁস-মুরগি, জৈব সার ও বায়োগ্যাসের সমন্বিত খামারে রূপ নিয়েছে। এতে নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।
চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের হাউলি গ্রামের সন্তান আবুল হাসান সবুজ। কর্মজীবনের শুরুতে দেশের ওষুধ ও প্রাণিসম্পদ খাতের প্রতিষ্ঠান রেনেটা বাংলাদেশে পাঁচ বছর চাকরি করেন। সেখানে ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে কৃষিবিজ্ঞানের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে পরে নিজেই ডেইরি খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
বর্তমানে তিনি ঝিকরগাছা শহীদ মশিয়ূর রহমান ডিগ্রি কলেজের কৃষিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের খামার পরিচালনা করছেন তিনি।
ছোট পরিসর থেকে বড় খামার
শুরুতে তিনটি গরু ও বিভিন্ন জাতের ১০টি ছাগল নিয়ে খামার শুরু করেন সবুজ। ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকেন পরিধি। বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি গাভী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি গাভী থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি দুধ উৎপাদন হয় বলে জানান তিনি।
খামারের উৎপাদিত দুধ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি যশোর শহরের বিসমিল্লাহ ডেইরি, আদি ঘোষ ডেইরি, সাতক্ষীরা ঘোষ ডেইরিসহ বিভিন্ন অর্গানিক সুপার শপে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবারে সরাসরি দুধ বিক্রি করেন সবুজ। খামারের দুধ দিয়ে গাওয়া ঘিও তৈরি করা হয়।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গো-খাদ্য ব্যবস্থাপনা
খামারে গাভীর খাদ্য ও পরিচর্যায় নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করা হয়। সকালে তাজা নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে সুষম খাদ্য, বিকেলে দানাদার খাদ্য এবং রাতে শুকনা খড় দেওয়া হয়।
গাভীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গোসল করানো হয়। সবুজ জানান, প্রতিদিন খামারের গবাদিপশুর খাদ্যের পেছনে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে দানাদার খাদ্য, ভুসি, খৈল, খড় ও সবুজ ঘাসের খরচ রয়েছে।
খাদ্য ব্যয় কমাতে এবং সারা বছর সবুজ ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজের তিন বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেছেন তিনি।
গরুর পাশাপাশি মাছ, ফল ও সবজি
সবুজের উদ্যোগ শুধু ডেইরি খামারে সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের জমিতে কলা, ড্রাগন ফল, আম এবং বিভিন্ন মৌসুমি শাক-সবজি চাষ করছেন তিনি। পালন করছেন দেশি মুরগি, হাঁস ও কবুতর। বাড়ির পাশের পুকুরে বিভিন্ন জাতের মাছও চাষ করা হচ্ছে।
খামারের গোবর ও অন্যান্য বর্জ্যও কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব বর্জ্য থেকে জৈব সার, ভার্মি কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হয়। বায়োগ্যাস পরিবারের রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উৎপাদিত জৈব সার ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করা হচ্ছে ফল, সবজি ও ঘাসের জমিতে।
খামারে কর্মসংস্থান
সবুজের এই উদ্যোগে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আরও দুইজন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের একজন মিলন হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে মাসিক ১২ হাজার টাকা বেতনে কাজ করি। নিয়মিত বেতন পাওয়ায় পরিবার নিয়ে ভালো আছি। এখানকার কাজের পরিবেশও ভালো। মালিক আমাদের নিজের পরিবারের মতো দেখেন।’
সবুজের বাবা ওয়াজ্জেল হোসেন বলেন, ‘ছেলের কঠোর পরিশ্রমে আজ আমরা গর্বিত। ও চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের মেধা দিয়ে এই খামার তৈরি করেছে। আজ ওর কারণে পরিবার সচ্ছল হয়েছে, এলাকার মানুষও দুধ পাচ্ছে।’
সবুজের ছোট ভাই ও পশুচিকিৎসক শাহিনুজ্জামান টনি বলেন, ‘কৃষিবিজ্ঞান ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খামারে প্রয়োগ করায় ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিয়মিত গরুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিই।’
নিয়মিত দুধ ক্রেতা বাড়ীয়ারী গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সবুজ ভাইয়ের খামারের দুধ ভালো। আমরা নিয়মিত এখান থেকে দুধ ও ঘি কিনি।’
আরও বড় করার পরিকল্পনা
নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে আবুল হাসান সবুজ বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা থাকলে যেকোনো খাত থেকে সফল হওয়া সম্ভব। আমি খামারটি আরও বড় করতে চাই। এতে আরও বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারব।’
যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দুগ্ধ উৎপাদনে আবুল হাসান সবুজের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ তরুণরা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে এভাবে এগিয়ে এলে দেশের ডেইরি ও কৃষি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।’


























