"এখন বৃক্ষরোপণের মৌসুম। সাধারণত জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত চারা বা বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সময়। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে সেচের ব্যবস্থা থাকলে বছরের প্রায় সব মৌসুমেই গাছ লাগানো যায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করা অত্যন্ত জরুরি। এসব বিষয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘রানার কৃষিতে’ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।"
বৃক্ষ বা গাছ আমাদের পরম বন্ধু। গাছ ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য গাছ বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। এ ছাড়া আমরা গাছ থেকে খাদ্য, ফলমূল, জ্বালানি, মূল্যবান কাঠ ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধ পাই। পরিবেশ ও মানুষের জীবনে বৃক্ষের রয়েছে নানাবিধ অবদান।
বৃক্ষ বায়ুদূষণ রোধ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে, অক্সিজেন ও খাদ্য জোগান দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি ঘটায়, জীবন রক্ষাকারী ঔষধের উপাদান সরবরাহ করে এবং মাটি রক্ষা ও ক্ষয় রোধ করে। সর্বোপরি বৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
একটি দেশের আদর্শ পরিবেশের জন্য সেই দেশের মোট ভূমির প্রায় ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ। তাই দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বৃক্ষ প্রধানত চার ধরনেরÑফলজ, বনজ, ঔষধি ও ছায়াদানকারী। বৃক্ষ বা চারার ধরন এবং ভবিষ্যতে গাছের আকার বিবেচনা করে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। আম, জাম, লিচু ও কাঁঠাল ২৫ থেকে ৩০ ফুট দূরত্বে রোপণ করতে হবে। পেয়ারা, শরিফা, আতা, বেল, ডালিম, সফেদা, বাতাবি লেবু ও জামরুল ১০ থেকে ১২ ফুট দূরত্বে লাগানো ভালো।
নারিকেল, তাল, খেজুর ও সুপারি ৬ থেকে ৮ ফুট দূরত্বে; হরিতকি, জলপাই ও নিম ৮ থেকে ১০ ফুট দূরত্বে রোপণ করতে হবে। মেহগনি, রেইনট্রি, করই, সেগুন ও বাবলা ৬ থেকে ৮ ফুট দূরত্বে লাগাতে হবে। অন্যদিকে বট, কৃষ্ণচূড়া, কদম, অশ্বত্থ, পিপুল, শিরীষ, হিজল ও গাব প্রভৃতি বড় আকারের বৃক্ষ ৩০ থেকে ৩৫ ফুট দূরত্বে রোপণ করা উচিত।
এভাবে গাছের ধরন অনুযায়ী দূরত্ব নির্ধারণ করে চারা বা বৃক্ষ রোপণের ৭ থেকে ১০ দিন আগে গর্ত তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত দূরত্ব অনুযায়ী প্রায় ১ ফুট গভীর ও ১ ফুট বৃত্তাকার বা প্রশস্ত গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্ত তৈরির সময় গর্তের ওপরের উর্বর মাটি আলাদা করে নিতে হবে।
ওই গর্তের ওপরের মাটির সঙ্গে ২ থেকে ৩ কেজি পচা গোবর বা ভার্মি কম্পোস্ট সার মিশিয়ে দিতে হবে। এর সঙ্গে ৫০ গ্রাম এমওপি, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০০ গ্রাম টিএসপি সার মিশাতে হবে। মাটিতে উইপোকা ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকার সমস্যা থাকলে রোপিত চারা রক্ষার জন্য অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে দানাদার রাজধান ১০ জি, ডায়াজিনন ১৪ জি, লিডেলÑএর যেকোনো একটি ১০ গ্রাম অথবা লিকুইড সেতারা, ডারসবান, রিজেন্টÑএর যেকোনো একটি ৫ মিলিলিটার গর্তের মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমোদিত পণ্য, সঠিক মাত্রা এবং লেবেলে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
সার ও বালাইনাশক মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তটি মাটি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং আবর্জনা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে গর্তে পানি ছিটিয়ে মাটির আর্দ্রতা ঠিক রাখতে হবে। এভাবে ৭ থেকে ১০ দিন পর চারা রোপণের উপযোগী হবে।
এরপর চারা বা কলমের গোড়ার মাটি যে অবস্থায় ছিল, সেই মাটি বরাবর গর্তের মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে। চারার চারপাশে সমভাবে মাটি দিয়ে হাত দিয়ে ভালোভাবে চেপে দিতে হবে। এরপর পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে এঁটে দিতে হবে, যাতে চারার গোড়ার মাটি শক্তভাবে বসে যায়।
চারা রোপণের পর গরু-ছাগলসহ গবাদিপশুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চারার চারপাশ ঘিরে দিতে হবে। চারা যাতে বাতাসে বা ঝড়ে পড়ে না যায়, সেজন্য খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে রাখতে হবে। মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা না থাকলে মাঝে মাঝে পানি সেচ দিতে হবে।
চারা রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চারার গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, মাটির আর্দ্রতা ঠিক রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। রোগবালাই বা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গাছ লাগানো শুধু পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার দায়িত্ব। তাই সঠিক দূরত্বে, সঠিক নিয়মে চারা রোপণের পাশাপাশি লাগানো প্রতিটি গাছের যত্ন নিতে হবে।


























