সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬

২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিল ডাকাতিয়ায় আশার নাম পলি নেট হাউস

জলাবদ্ধতার বুকে সবুজ বিপ্লব

সংবাদদাতা, খুলনা

প্রকাশিত: ১৪:৩০, ৯ আগস্ট ২০২৬

জলাবদ্ধতার বুকে সবুজ বিপ্লব

খুলনার বিল ডাকাতিয়াসহ যশোর-খুলনা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধ থাকে। বর্ষা এলেই মাঠঘাট পানিতে তলিয়ে যায়, দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে সবজির চারা উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ সময়মতো মানসম্মত চারা না পেলে কৃষকদের মৌসুমি সবজি চাষও ব্যাহত হয়। এমন বাস্তবতায় কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে পলি নেট হাউস প্রযুক্তি।


একসময় যেখানে জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের দূর-দূরান্ত থেকে চারা সংগ্রহ করতে হতো, সেখানে এখন স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের সবজির চারা। শুধু নিজের এলাকার চাহিদা পূরণই নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের কাছেও নির্ভরযোগ্য চারার উৎস হয়ে উঠছে এসব পলি নেট হাউস। ফলে জলাবদ্ধতাকে সীমাবদ্ধতা নয়, বরং নতুন সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার এক সফল উদাহরণ তৈরি হয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলায়।


কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পলি নেট হাউস হলো মোটা ও টেকসই পলিথিন দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের সুরক্ষিত ঘর। এর ভেতরে লোহার তৈরি ট্রে বা নেটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন সবজির বীজ বপন করা হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত হওয়ায় চারা রোগবালাই, অতিবৃষ্টি কিংবা ঝড়ো আবহাওয়ার ক্ষতি থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকে। একই সঙ্গে চারা সমানভাবে বেড়ে ওঠে এবং কৃষকের হাতে পৌঁছায় উন্নতমান নিশ্চিত করে।


ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, একটি পলি নেট হাউসে একসঙ্গে এক লাখেরও বেশি চারা উৎপাদন করা সম্ভব। সঠিক ব্যবস্থাপনায় বছরে আট থেকে দশ লাখ পর্যন্ত চারা উৎপাদন করা যায়। বর্তমানে উপজেলার খর্ণিয়া ও আটলিয়া ইউনিয়নে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ব্যক্তি উদ্যোগে তিনটি পলি নেট হাউস গড়ে উঠেছে। এসব হাউসে প্রধানত বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।


তার মতে, জলাবদ্ধ এলাকায় এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মানসম্মত চারা উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতার সময়ও চারা নিরাপদ থাকে। ফলে কৃষক নির্ধারিত সময়েই চারা হাতে পান এবং মৌসুমি সবজি চাষে কোনো বিলম্ব হয় না।
ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা তাপস সরকার এ পরিবর্তনের অন্যতম সফল মুখ। তার প্রতিষ্ঠিত রুদ্রনীল এগ্রি নার্সারি এখন বিল ডাকাতিয়াসহ যশোর-খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকদের কাছে পরিচিত একটি নাম। উন্নতমানের সবজির চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেননি, স্থানীয় কৃষকদের জন্যও নির্ভরযোগ্য চারার উৎস গড়ে তুলেছেন।


তাপস সরকার ২০১৭ সাল থেকে সবজির চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। তবে ২০২১ সালে সরকারি সহযোগিতায় পলি নেট হাউস স্থাপনের পর তার নার্সারির কার্যক্রম নতুন গতি পায়। বর্তমানে তিনি চুইঝাল, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ, বেগুন, টমেটো, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন প্রজাতির সবজির উন্নতমানের চারা উৎপাদন করছেন।
তার নার্সারি থেকে এখন ডুমুরিয়া ছাড়াও যশোরের কেশবপুর, নড়াইল এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক মৌসুমভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী চারা সংগ্রহ করেন। কৃষকদের দাবি, এখান থেকে সংগ্রহ করা চারার গুণগত মান ভালো হওয়ায় মাঠে রোপণের পর ফলনও সন্তোষজনক হচ্ছে।


তাপস সরকার বলেন, সরকারি সহায়তায় পলি নেট হাউস স্থাপনের ফলে সারা বছর উন্নতমানের চারা উৎপাদন অনেক সহজ হয়েছে। এ কাজে তার স্ত্রী বিজয়া সরকার সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছেন। পারিবারিক উদ্যোগেই তারা কৃষিভিত্তিক একটি সফল উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের সহায়তা আরও বাড়ানো হলে বিল ডাকাতিয়াসহ জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী আরও বেশি পরিমাণে মানসম্মত চারা উৎপাদন ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচও কমবে এবং সময়মতো চারা পাওয়ার নিশ্চয়তা বাড়বে।


স্থানীয় কৃষকদের মতে, জলাবদ্ধ এলাকায় সবজি চাষের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল মানসম্মত চারার সংকট। এখন স্থানীয়ভাবে চারা উৎপাদন হওয়ায় সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে। সময়মতো চারা পাওয়ায় কৃষিকাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী করা যাচ্ছে এবং ফলনও বাড়ছে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: