সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬

২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পানির অভাব দূর হওয়ায় কমেছে খরচ, উন্নত মানের আঁশ ও ভালো দামের আশা স্থানীয় কৃষকদের

ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর)

প্রকাশিত: ১৫:৪৪, ৯ আগস্ট ২০২৬

পানির অভাব দূর হওয়ায় কমেছে খরচ, উন্নত মানের আঁশ ও ভালো দামের আশা স্থানীয় কৃষকদের

একসময় খালটি ছিল মৃতপ্রায়। বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষার পানিও সেখানে আর স্থায়ী হতো না। পানি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে প্রতি মৌসুমেই চরম দুর্ভোগে পড়তেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরে পুকুর ভাড়া নিয়ে কিংবা অন্যের জলাশয়ে অতিরিক্ত খরচ করে পাট পচাতে হতো। সেই দুর্ভোগ এখন অনেকটাই অতীত। সরকারি উদ্যোগে খাল পুনঃখননের পর এবার বর্ষার পানিতে থইথই করছে খাল। আর সেই পানিতেই দল বেঁধে মনের আনন্দে পাট জাগ দিচ্ছেন কৃষকরা। উন্নতমানের আঁশ ও ভালো দামের প্রত্যাশায় তাদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি।


ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ দক্ষিণপাড়া স্লুইসগেটসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহ আগেও যে খালটি ছিল আগাছা আর পলিতে ভরাট, এখন সেখানে টইটম্বুর পানি। খালের দুই তীরে সারি সারি লাগানো বনজ ও ফলজ গাছের চারা পুরো এলাকাকে দিয়েছে এক মনোরম রূপ। খালের পানিতে সারিবদ্ধভাবে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে পাটের আঁটি। কেউ নতুন করে পাট নামাচ্ছেন, কেউ আবার পচা পাট তুলে আঁশ ছাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয় প্রবীণরাও সন্তোষ প্রকাশ করছেন।


বড়ভাগ গ্রামের কৃষক ইমদাদুল শেখ বাড়ির পাশের খালে পাট জাগ দিতে দিতে বলেন, ‘আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে পাট পচাতে হতো, এতে খরচও বেশি লাগত। এবার বাড়ির পাশেই খালে পাট জাগ দিতে পারছি। সময়ও বাঁচছে, খরচও কমছে। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের অনেক উপকার করেছে।’


একই গ্রামের কৃষকরা জানান, আগে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক সময় পাট ঠিকমতো পচত না। এতে আঁশের মান খারাপ হতো এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যেত না। এবার সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে।
মালা গ্রামের কৃষক কামরুল শেখ বলেন, ‘আমি এবার দেড় একর জমিতে পাট চাষ করেছি। আগে অন্যের পুকুর ভাড়া নিতে হতো। অনেক সময় সেচ দিয়ে পানি তুলে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এতে অতিরিক্ত খরচ হতো। এবার খালেই সব কাজ করতে পারছি। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে এবং ভালো আঁশ পাওয়ার আশা করছি।’


স্থানীয়দের মতে, খাল পুনঃখননের সুফল শুধু পাট চাষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্ষার পানি সংরক্ষণ হওয়ায় আগামী মৌসুমে সেচ সুবিধাও বাড়বে। পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল তৈরি হবে এবং এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ হবে।
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, ‘খাল পুনঃখননের কারণে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা সরাসরি এর সুফল পাচ্ছেন। এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এলাকার কৃষি উৎপাদন আরও বাড়বে।’


উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাগর হোসেন সৈকত বলেন, ‘প্রকল্পটি ছোট হলেও বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শৈথিল্য ছিল না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’


আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নূর মৌসুমী বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথভাবে খালটি পুনঃখনন করা হয়েছে। এর সুফল ইতোমধ্যেই কৃষকরা পেতে শুরু করেছেন। এটি শুধু কৃষির উন্নয়নেই নয়, এলাকার জলাধার সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতেও জনস্বার্থ ও কৃষির উন্নয়নে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এবং উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি বড়ভাগ দক্ষিণপাড়া স্লুইসগেট থেকে মিলন মোল্যার বাড়ি পর্যন্ত ৫৭০ মিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৮ টাকা।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় কাজের মান, স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের উপস্থিতি ও কাজের হিসাব-নিকাশ নিয়মিত যাচাই করা হয়। এতে শ্রমিক অনুপস্থিতিজনিত কারণে উদ্বৃত্ত থাকা ৩৭ হাজার ৩৭০ টাকা সরকারি বিধি অনুযায়ী কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: