সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬

২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুগন্ধের আড়ালে অসীম সম্ভাবনা

এক ছাদ বাগানেই লালন-পালন করা হচ্ছে প্রায় ৩৫০টি দুষ্প্রাপ্য শ্বেতচন্দন গাছ

যশোরে ‘সবুজ সোনা’ চন্দনের বাণিজ্যিক বিপ্লব

উবাঈদ সামি

প্রকাশিত: ১২:৩৪, ৯ আগস্ট ২০২৬

যশোরে ‘সবুজ সোনা’ চন্দনের বাণিজ্যিক বিপ্লব

যশোরের বাগমারা পাড়া বিসমিল্লাহ গ্যারেজ। শহরের ব্যস্ত পরিবেশের ভেতরেই এক বাড়ির একান্নবর্তী পরিবারের তিনটি ছাদে চোখ জুড়িয়ে যায় অসাধারণ সবুজের সমারোহ দেখে। সেখানে ছোট-বড় গামলা আর বিশেষ মাটিতে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে বিরল প্রজাতির গাছ। সাধারণ দর্শনার্থীদের চোখ আটকে যায় একটি বিশেষ উদ্ভিদের কাছে। এটি আর দশটি বনসাই বা সাধারণ গাছ নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম দামি এবং ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ ‘শ্বেতচন্দন’।


এক ছাদ বাগানেই লালন-পালন করা হচ্ছে প্রায় ৩৫০টি দুষ্প্রাপ্য শ্বেতচন্দন গাছ! এ যেন এক নীরব ভেষজ বিপ্লব, যা যশোরকে ছাড়িয়ে পুরো দেশের অর্থনীতিতেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
এই অসাধারণ উদ্যোগের পেছনের কারিগর ৪৫ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বনসাইয়ের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে প্রবাস জীবন কাটাতে মালয়েশিয়া গিয়ে এক চীনা ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে সাজানো বনসাই দেখে অনুপ্রেরণা পান। ২০১০ সালে দেশে ফিরে কৃষিতে নামলেও প্রথমে সফলতা পাননি।


তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ২০১৩ সালে তিনি বট, পাকুড় ও অশ্বত্থের চারা দিয়ে বনসাই তৈরি শুরু করেন। এরপর যশোর বন বিভাগের ঝুমঝুমপুর নার্সারি থেকে মাত্র ১০টি শ্বেতচন্দনের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাবলিক লাইব্রেরির বই-পুস্তক ও ম্যাগাজিন ঘেঁটে নিজেই তৈরি করেন গাছের জন্য উপযুক্ত বিশেষ মাটি।


গাছের রোগবালাই দূর করতে কেমিক্যাল কীটনাশকের বদলে তিনি ব্যবহার করেন মেহগনি পাতা পচা পানি ও লেবুর রসের পরিবেশবান্ধব মিশ্রণ। সেই ১০টি চারা থেকে আজ তার ছাদ বাগানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন বয়সের সাড়ে ৩০০ শ্বেতচন্দনের বনসাই এবং নার্সারিতে রয়েছে ২-৩ বছর বয়সী প্রায় ৪,০০০ চারা।


ধারণা করা হয়, চন্দনের আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এর ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। রামায়ণ, মহাভারত এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও (খ্রিস্টপূর্ব-২০০) চন্দনের উল্লেখ পাওয়া যায়।


বিশ্ববাজারে শ্বেতচন্দনকে বলা হয় ‘সবুজ সোনা’। একটি পরিণত শ্বেতচন্দন গাছ (২০ বছর বয়সী) প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি কাঠ দেয়, যার প্রতি কেজির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সমাজ বন বিভাগ যশোরের তথ্যমতে, এক একর জমিতে চন্দন চাষে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫-২০ বছর পর আয় হতে পারে ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত!
পেনিসিলিন আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে গনোরিয়া রোগের চিকিৎসায় চন্দনের তেল ব্যবহৃত হতো। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ব্রঙ্কাইটিস, চর্মরোগ, ঘামাচি, বসন্ত এবং হজমের সমস্যায় এর ব্যবহার প্রাচীন। রূপচর্চায় এর জাদুকরী উপকারিতা তো সর্বজনবিদিত।


এছাড়া সনাতন ধর্মে পূজা-অর্চনা ও শেষকৃত্যে চন্দন কাঠ অপরিহার্য। মুসলিম ঐতিহ্যে সুগন্ধি আতর তৈরিতে চন্দনের তেল অনন্য উপাদান।
সম্প্রতি যশোর জেলা বন বিভাগ আয়োজিত বৃক্ষমেলায় প্রথমবারের মতো শ্বেতচন্দন নিয়ে হাজির হন সাজ্জাদ হোসেন। মেলার দর্শনার্থীদের মধ্যেও চন্দন কেনা নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। মেলায় শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্যোক্তার পুরস্কারও জিতে নেন সাজ্জাদ হোসেন। 


যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র সবুজ বৈরাগী জানান, মাত্র ৫০ টাকায় ৪৪ দিন বয়সী চারা কিনে তিনি ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে এটিকে দেখছেন। অন্যদিকে অরনিমা নামের এক দর্শনার্থী স্মৃতি এবং ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকে কেনা চারাটি ২০ বছর পর নিজের পূজায় ব্যবহারের আশা ব্যক্ত করেন।


সাজ্জাদ হোসেন বর্তমানে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়ার জন্য ১৪ বছর বয়সী ২টি বিশেষ চারাসহ মোট ২,০০০টি চারা প্রস্তুত রেখেছেন। সরকারি ভবনের অব্যবহৃত জায়গায় চন্দন রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নিজ কাঁধে নেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন এই উদ্যোক্তা।


বাংলাদেশ চন্দন চাষের জন্য অনুকূল হলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা ও সুরক্ষার অভাবের কারণে গাছটি দেশে কিছুটা বিলুপ্তপ্রায়। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর এস.এম আইয়ূব হোসেন এবং সহকারী বন সংরক্ষক অমিতা মন্ডল এই খাতের বেশ কিছু দিক তুলে ধরেন। এরমধ্যে-
‘দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্য ও ঋণ সহায়তা: চন্দন গাছ থেকে প্রথম ৫-৭ বছর কোনো আর্থিক আয় আসে না। তাই তরুণ উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া জরুরি’।
সুরক্ষা ও জাতীয় নীতি: মূল্যবান গাছ হওয়ায় চুরির ঝুঁকি থাকে। তাই উপযুক্ত আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।


গবেষণা ও টিস্যু কালচার: জেনেটিক রিসোর্স সংরক্ষণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চন্দনের ওপর উচ্চতর গবেষণা এবং উন্নত টিস্যু কালচারের সম্প্রসারণ ঘটানো দরকার।
একটি ছোট্ট চারা-যার আজকের দাম মাত্র ৫০ টাকা, সঠিক পরিচর্যা ও ২০ বছরের ধৈর্য শেষে সেটিই হতে পারে লাখ লাখ টাকার জাতীয় সম্পদ। সাজ্জাদ হোসেনের মতো নিবেদিত প্রাণ উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেছেন, সুযোগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শ্বেতচন্দনের এই ‘সবুজ সোনা’ বিপ্লব বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতি।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: