যশোরের চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজার। সরকার অনুমোদিত সার বিক্রেতা আব্দুল্লাহ ট্রেডার্সে সার কিনতে এসে খালি হাতে ফিরছেন কৃষকরা। কারণ, পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। অথচ একই বাজারের কয়েকটি অনুমোদনহীন দোকানে সরকারি ভর্তুকির সার প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে তবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে।
শুধু সলুয়া নয়, পাশাপোল, মালিগাতী, ঝিকরগাছার বাকড়া, শার্শার সাড়াতলা, বাঘারপাড়ার ছাতিয়ানতলাসহ যশোর জেলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি সার নির্ধারিত বিক্রয়ব্যবস্থা উপেক্ষা করে একটি অংশ রাতের আঁধারে অনুমোদনহীন ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যাচ্ছে। এরপর সেই সারই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কৃষকদের কাছে।
এতে সরকার কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিলেও তার প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। বরং মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি চক্র অতিরিক্ত মুনাফা করছে।
নীতিমালার বাইরে ৮৬৮ দোকানে সার বিক্রিঃ
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার বিতরণ নীতিমালা অনুযায়ী সার বিক্রির অনুমতি রয়েছে কেবল বিসিআইসি ও বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার এবং তাঁদের অধীনস্থ সাব-ডিলারদের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আটটি উপজেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার ও সাব-ডিলার রয়েছেন ১৬২ জন এবং বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলার ১৪১ জন।
অন্যদিকে জেলা পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, জেলায় সার ও কীটনাশকের দোকানের সংখ্যা ১ হাজার ১৭১টি। অর্থাৎ অনুমোদিত ডিলার-সাবডিলারের বাইরে প্রায় ৮৬৮টি দোকান রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণ বিক্রি হচ্ছে। অনুসন্ধানে এসব দোকানের অনেকগুলোতে সরকারি সারও বিক্রির তথ্য মিলেছে।
সদর উপজেলার দেওয়াড়া ইউনিয়নের চাঁন্দুটিয়া গ্রামের কৃষক ওসমান আলী বলেন, ‘সরকার ইউরিয়া ২৫ টাকা, ডিএপি ১৯ টাকা, টিএসপি ২৫ টাকা ও এমওপি ১৮ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এমওপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা, টিএসপি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ডিএপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ইউরিয়া অনেক জায়গায় ৩০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেই দামে সার পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’
বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে সারের কোনো সংকট নেই। জেলার নয়টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫০ মেট্রিক টন হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৪ হাজার মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। ইউরিয়ার মজুদও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। গত জুন মাসে ডিলারদের মধ্যে ২ হাজার ১০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ১ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন ডিএপি, ৮০৮ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ১২৩ মেট্রিক টন এমওপি বিতরণ করা হয়েছে। জুলাই মাসের জন্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার বিতরণ করা হয়েছে।
কিন্তু সরকারি এই তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে। সাব-ডিলারদের দাবি, তারা চাহিদার ২০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি সারই পাচ্ছেন না। ফলে কৃষকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না তারা।
সদর উপজেলার চাঁন্দুটিয়া বাজারের বিসিআইসির খুচরা সার বিক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা ডিলারের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার পাই না। কারণ আমরা সরাসরি কৃষকের কাছে বিক্রি করি। কিন্তু কিছু ডিলার অধিক মুনাফার আশায় রাতের আঁধারে অনুমোদনহীন দোকানদারদের কাছে সার বিক্রি করে দেয়।’
চৌগাছা উপজেলার ধুলিয়ানী ইউনিয়নের ডিলার রহমতুল্লাহ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ১৩ জন সাব-ডিলার এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি কৃষক রয়েছে। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী অর্ধেক সার কৃষকের কাছে এবং অর্ধেক সাব-ডিলারদের কাছে বিক্রি করি। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সার কম পাই। কিছু সার বিভিন্ন কারণে বাইরে বিক্রি করতে হয়।’
একই উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের ডিলার ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সব ডিলার এক রকম নয়। তবে অনেক ডিলার কৃষকের কাছে বিক্রি না করে অধিক লাভের আশায় খোলা বাজারে সার বিক্রি করছেন। অনেকেই শুধু নামে ডিলার, কিন্তু সার তুলে অন্যত্র বিক্রি করে দেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অনুমোদনহীন ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা ডিলারদের কাছ থেকে কৃষকের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনি। কোনো পাকা ক্যাশ মেমোও দেওয়া হয় না। পরে সেই সার বাজারে বিক্রি করি। কৃষি বিভাগের অভিযান আসার খবর আগেই পেয়ে যাই। তখন দোকান বন্ধ করে চলে যাই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাব-ডিলার বলেন, ‘আমরা সরকারি দামে সার বিক্রি করতে চাই। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকেই যদি প্রায় সরকারি খুচরা দামে সার কিনতে হয়, তাহলে পরিবহন খরচ যোগ করে সরকারি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এতে কৃষক আমাদের ওপরই ক্ষুব্ধ হন।’
মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘প্রতিটি ডিলার ও সাব-ডিলার পয়েন্টে আমাদের কর্মকর্তাদের ফোন নম্বর দেওয়া আছে। কৃষকদের ক্যাশ মেমো সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। কেউ অতিরিক্ত দাম নিলে অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মাঠে মনিটরিং করছি। বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। কোথাও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে বা কেউ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। সার বিতরণব্যবস্থাকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ডিলার থেকে কৃষক পর্যন্ত প্রতিটি বস্তার গতিপথ নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বস্তায় কিউআর কোড সংযুক্ত করা, অনলাইনে বরাদ্দ ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগের জন্য কার্যকর হটলাইন চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন দোকানে সরকারি সার বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করলে ভর্তুকির অর্থের বড় একটি অংশ অসাধু চক্রের হাতেই চলে যাবে।
সরকারি হিসাবে গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে, নীতিমালাও স্পষ্ট। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে সেই সার পৌঁছাতে না পারা এবং একই সময়ে অনুমোদনহীন দোকানে বেশি দামে সরকারি সার বিক্রির ঘটনা প্রশ্ন তুলছে পুরো বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে। বরাদ্দ থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির সুফল প্রকৃত কৃষকের বদলে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতেই চলে যাবে।


























