সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬

২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহেশপুরে সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক খামারিরা

কোটি টাকার মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বন্ধ!

বসির আহাম্মেদ, ঝিনাইদহ

প্রকাশিত: ১২:৪৩, ৯ আগস্ট ২০২৬

কোটি টাকার মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বন্ধ!

প্রান্তিক খামারিদের দোরগোড়ায় আধুনিক প্রাণিসম্পদ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে দেওয়া মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক (এমভিসি) ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কোটি টাকার অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসমৃদ্ধ গাড়িটি সচল থাকলেও জনবল সংকট, জ্বালানি ব্যয়ের অভাব, বাজেট সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো খামারি কাক্সিক্ষত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)-এর আওতায় মহেশপুর উপজেলায় মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পশুর রোগ নির্ণয়, প্রাথমিক চিকিৎসা, কৃত্রিম প্রজনন, খামারিদের কারিগরি পরামর্শ, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক খামার পরিচালনা বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত কার্যক্রমে দেখা দেয় নানা প্রতিবন্ধকতা।


স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার অধিকাংশ খামার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত। গরু, ছাগল বা অন্য গবাদিপশু অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে নিয়ে যেতে অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহনের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় পশুর অবস্থারও অবনতি ঘটে। তাদের দাবি, মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক নিয়মিত চালু থাকলে বাড়িতেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া সম্ভব হতো।


মহেশপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে. এম. আসাদুজ্জামান জানান, সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণের পর নাটিমা ইউনিয়নে একদিন মোবাইল ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে নিয়মিতভাবে এ সেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি।


তিনি বলেন, ‘অনেকেই মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিককে পৃথক প্রকল্প মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে এটি এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় প্রাপ্ত একটি বিশেষ সুবিধা। ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গাড়ি পরিচালনা, জ্বালানি ব্যয় ও জনবল ব্যবস্থাপনায় কিছু বাস্তব সমস্যা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে জ্বালানি ব্যয় ও জনবলসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হবে। তখন মোবাইল ক্লিনিকের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’
জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে ১১টি পদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র চারটি পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (কৃত্রিম প্রজনন) এবং একজন ড্রেসার দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাকি পদগুলো শূন্য থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


খামারিদের মতে, মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকটি নিয়মিত চালু হলে শুধু চিকিৎসাসেবাই নয়, রোগ প্রতিরোধ, কৃত্রিম প্রজনন ও আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শও সহজেই পাওয়া যাবে। এতে প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি খামারিদের আর্থিক ক্ষতিও কমবে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এ গুরুত্বপূর্ণ সেবাকে স্থায়ীভাবে চালু রাখতে আলাদা বাজেট বরাদ্দ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বর্তমানে সচল থাকা মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকটি আবারও মাঠে নামবে এবং মহেশপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো প্রান্তিক খামারি নিয়মিত ও সহজে প্রাণিসম্পদ চিকিৎসাসেবা পাবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: