সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬

২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উৎপাদন ব্যয়ের চাপে ধুঁকছে যশোরের মৎস্যখাত

সালমান হাসান রাজিব

প্রকাশিত: ১৫:১৯, ৯ আগস্ট ২০২৬

উৎপাদন ব্যয়ের চাপে ধুঁকছে যশোরের মৎস্যখাত

স্থানীয় চাহিদার তিন গুণেরও বেশি মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের সার্বিক মাছ উৎপাদনের একটি বড় অংশীদার যশোর। তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একসময়কার এই লাভজনক খাতে এখন দুর্দিন চলছে। ফিশ ফিড (মাছের খাদ্য), রেণু উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্ল্যান্ড ও হরমোন, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হ্যাচারি মালিক ও মাছচাষিদের। টিকে থাকতে না পেরে ইতোমধ্যে জেলার ৪৪টি হ্যাচারি বন্ধও হয়ে গেছে।


হ্যাচারি মালিকেরা জানান, বহুসংখ্যক হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেণুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে ৮২টি হ্যাচারিতে রেণু উৎপাদন হতো। বর্তমানে চালু রয়েছে ৪৪টি হ্যাচারি। তবে জেলার মৎস্য বিভাগ বলছে, বর্তমানে ৪২টি হ্যাচারি চালু আছে।


হ্যাচারি মালিকদের ভাষ্য, হ্যাচারির বিদ্যুৎ বিল শিল্প রেটে (হার) ধার্য করায় ব্যবসায়টিতে একরকম ধস নেমেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের রেটে বিদ্যুৎ বিল গুণতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে বিক্রির দাম থেকে লাভ দূরে থাক উৎপাদন খরচও উঠছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে হ্যাচারি বন্ধ করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে এই খাতে বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকি বা দীর্ঘদিনের দাবি কৃষি রেট চালু না করলে ব্যবসায় সচল রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।


যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, মাছ উৎপাদনের কাজে অতি প্রয়োজনীয় তেল ও বিদ্যুতের দাম অব্যাহত বৃদ্ধির ফলে এই সেক্টর ক্রমাগত লোকসান গুনছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় মাছের পুকুরে ব্যবহৃত স্যালো মেশিন ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে হ্যাচারির বিভিন্ন কাজে পানি সরবরাহে মোটর চালনার ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে অনেক। এছাড়াও মাছের খাবারসহ চাষ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে হ্যাচারিতে ডিম থেকে উৎপাদিত রেণুর দাম বাড়েনি। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে হ্যাচারি মালিকদের।


এদিকে মাছের খামারিরা বলছেন, মাছের খাবার এবং ওষুধসহ অন্যান্য উপকরণের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে মাছ লালন-পালন দুরূহ হয়ে পড়েছে। উৎপাদনের সব ধরনের উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পুকুরে মাছ রেখে বড় করে যারা বাজারে বিক্রি করেন তারা জেরবার দশায়।
মাছ চাষিরা জানান, দাম বাড়তে বাড়তে একবস্তা খৈলের দাম এখন ৩৩০০ থেকে ৩৫০০ টাকা। একবস্তা ফিডের দাম কোম্পানি ভেদে বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম ২২০০ টাকা পর্যন্ত। পুকুরের লিজ মূল্য বছর বছর বাড়ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় মাছের সন্তোষজনক দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এতে অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুণতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো রকমে ব্যবসায় টিকিয়ে রেখেছেন।


মৎস্য চাষি কল্যাণ সমিতি যশোর জেলা শাখার সিনিয়র সহসভাপতি ও ফাল্গুনী মৎস্য খামারের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান বাবলু জানান, শ্রমিক মজুরি, ফিড, ওষুধপত্র, সার, খৈলসহ পুকুরের লিজ মূল্য ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অব্যাহতভাবে উৎপাদনের উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে মাছের ব্যবসায়ের জৌলুস হারাচ্ছে। মুনাফার পরিমাণ অব্যাহতভাবে কমছে। এতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।


প্রতিবছরই চাহিদার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ মাছ উৎপাদন করছেন যশোরের মৎস্য চাষিরা। পুকুর থেকে শুরু করে বিল, বাঁওড়, নদী ও খালে জলশস্য মাছের ভাণ্ডারে পরিপূর্ণ করছেন। জেলায় বার্ষিক মাছের চাহিদা ৬৭ হাজার ৬৬১ দশমিক ১৮ মেট্রিক টন। চাহিদার বিপরীতে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৪ দশমিক ৩৫ মেট্রিক টন। উদ্বৃত্তের পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার ৫৩৩ দশমিক ১৭ মেট্রিকটন। চাহিদার উদ্ধৃতি মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ ছাড়াও বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বার্ষিক রপ্তানি ৮ হাজার ২৯২ দশমিক ৫৫ মেট্রিক টন। এদিকে যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সচল হ্যাচারিগুলোয় প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ কেজিরও বেশি রেণু ও ধানী পোনা উৎপাদিত হয়।


জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, বিদ্যুতের দামের কারণে হ্যাচারি সেক্টরে ক্ষতির মুখে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের বিদ্যুৎ বিল কৃষি রেটে নেওয়ার দাবি জানানো হলো সেটি করা হয়নি। কৃষি রেটে বিল ধার্য করা হলে শিল্পটির ধস থামানো সম্ভব হতো।


সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দীন চৌধুরী সুমন জানান, প্রায় প্রতিবছরই লোকসান গুনছেন হ্যাচারি মালিকরা। গত বছর তার ১৫ লাখের বেশি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এভাবে প্রতি বছর লোকসান কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি জানান, ভর্তুকি দিয়ে অথবা কৃষি রেটে বিদ্যুতের বিল ধার্য করা না হলে হ্যাচারি শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।


এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন জানান, হ্যাচারির বিদ্যুৎ বিল কৃষি রেটে ধার্যের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি অবগত। শিল্পের বদলে কৃষি রেটে হ্যাচারির বিদ্যুৎ বিল ধার্যের ব্যাপারটি বাস্তবায়িত হলে সেক্টরটিতে বিদ্যমান এ সমস্যার সমাধান হবে।


বহু সংখ্যক হ্যাচারি বন্ধের বিষয়ে প্রশ্নে তিনি জানান, এক সময় যশোরের হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু অন্যান্য জেলায় সরবরাহ হতো। তবে এখন সেসব জেলাতেও হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। এতে যশোরের হ্যাচারির ওপর নির্ভরতা কমেছে। পাশাপাশি লোকসানে থাকা অনেক হ্যাচারি বন্ধ হয়ে গেছে।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: