রোববার ১৬ আগস্ট ২০২৬

৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছাদ কৃষির সফলতায় নিয়মিত পরিচর্যা জরুরী

রানার কৃষি

প্রকাশিত: ১৩:২০, ১৬ আগস্ট ২০২৬

ছাদ কৃষির সফলতায় নিয়মিত পরিচর্যা জরুরী

শহর ও গ্রামে বাড়ির ছাদকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ ও বিষমুক্ত শাক-সবজি, ফলমূল, মসলা ও ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদন করা সম্ভব। টব, ড্রাম, বেড, বালতি কিংবা বিভিন্ন পাত্রে পরিকল্পিতভাবে ছাদ কৃষি গড়ে তুললে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজার খরচ কমানো যায়। পরিবেশ ঠান্ডা রাখা, অক্সিজেন বাড়ানো ও মানসিক প্রশান্তির ক্ষেত্রেও ছাদ কৃষির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ‘রানার কৃষি’র নিয়মিত আয়োজনে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।

ছাদ কৃষি হলো বাড়ির ছাদে টব, ড্রাম, বেড বা ট্রেতে শাক-সবজি, ফলমূল, মসলা ও ভেষজ উদ্ভিদের চাষ। শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার বাড়ির ছাদেই পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের কৃষি করা যায়।
ছাদ কৃষির মাধ্যমে বিষমুক্ত ও তাজা শাক-সবজি ও ফলমূল পাওয়া যায়। পাশাপাশি পরিবেশ ঠান্ডা রাখতে, অক্সিজেন বাড়াতে এবং শহরের সবুজায়ন বৃদ্ধি করতে এটি ভূমিকা রাখে। পরিবারের বাজার খরচ কমানোর পাশাপাশি ছাদে গাছের পরিচর্যা মানসিক প্রশান্তিও দিতে পারে। পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও আর্থিক—তিন দিক থেকেই ছাদ কৃষি উপকারী।


ছাদ প্রস্তুতি ও পাত্র নির্বাচন
ছাদে বাগান করার আগে সেখানে পানি জমে থাকে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। ছাদে ওয়াটারপ্রুফিং করা থাকলে ভালো। তবে ছাদের ওপর অতিরিক্ত ভার দেওয়া যাবে না। পাত্র ও মাটির ওজনসহ ছাদের ভার বহনক্ষমতা বিবেচনা করে ছাদ কৃষির পরিকল্পনা করতে হবে।
গাছ লাগানোর জন্য মাটির টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ড্রাম, বালতি ও ফোম বক্স ব্যবহার করা যায়। প্রতিটি পাত্রের নিচে অবশ্যই পানি নিষ্কাশনের জন্য ছিদ্র থাকতে হবে। বড় আকারের গাছের জন্য ২০ থেকে ৩০ লিটার ধারণক্ষমতার পাত্র প্রয়োজন হতে পারে।
মাটি তৈরি
ছাদ কৃষিতে ভালো ফলনের জন্য উপযোগী মাটির মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। আদর্শ মাটির মিশ্রণে ৫০ শতাংশ দোআঁশ মাটি, ৩০ শতাংশ পচা গোবর বা কম্পোস্ট এবং ২০ শতাংশ বালি বা কোকোপিট ব্যবহার করা যেতে পারে।
মাটি ঝুরঝুরে ও পানি নিষ্কাশন উপযোগী রাখতে হবে। পাত্রের আকার অনুযায়ী মাটির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে এবং গাছের ধরন অনুযায়ী পাত্র নির্বাচন করতে হবে।
যেসব ফসল চাষ করা যায়
ছাদে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি, মসলা, ভেষজ ও ফলমূল চাষ করা যায়। শাকের মধ্যে লালশাক, পালং শাক, ধনেপাতা ও লেটুস; সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ করা যেতে পারে।
মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে মরিচ, এলাচ ও আদা এবং ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে তুলসী, মালটা, কাগুজি লেবু, মেহেদী ও নিম লাগানো যায়। ফলমূলের মধ্যে আম, পেয়ারা, ডালিম ও ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ফলের গাছ ছাদে উপযোগী পাত্রে চাষ করা সম্ভব।
সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা
ছাদ কৃষিতে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। সাধারণভাবে প্রতিদিন অথবা এক দিন পরপর পানি দেওয়া যেতে পারে। তবে আবহাওয়া, গাছের ধরন ও মাটির আর্দ্রতা বিবেচনা করে সেচ দিতে হবে। সকাল অথবা বিকেলে পানি দেওয়া ভালো। অতিরিক্ত পানি দেওয়া যাবে না। পাত্রে পানি জমে থাকলে গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতি ১৫ দিন পরপর জৈব সার, কম্পোস্ট বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি টবে গাছের ধরন ও পাত্রের আকার অনুযায়ী ১ থেকে ২ কেজি জৈব সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। তরল সার বা জীবাণু সার ব্যবহার করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
পোকা ও রোগ দমন
ছাদ কৃষিতে পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে প্রথমে জৈব ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করা ভালো। নিম তেল ৩ থেকে ৫ মিলিলিটার প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা যায়। পোকা দমনে রসুন ও মরিচের নির্যাসও ব্যবহার করা যেতে পারে।


মাইটস, লাল মাকড়সহ ক্ষতিকর পোকা দমনে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে এবং পণ্যের লেবেলে দেওয়া মাত্রা ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভালো।


ছাদ কৃষিতে বাড়ির ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পাত্র এমনভাবে স্থাপন করতে হবে, যাতে শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি না থাকে।
ছাদ কৃষি শুধু অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনশীল করে না; এটি পরিবারের নিরাপদ খাদ্যের উৎস তৈরির পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পারিবারিক ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। তাই পরিকল্পিতভাবে ছাদ কৃষির সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: