রোববার ১৬ আগস্ট ২০২৬

৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘কারসাজিতে’ অস্থির ডিমের বাজার

সালমান হাসান রাজিব

প্রকাশিত: ১৩:০৯, ১৬ আগস্ট ২০২৬

‘কারসাজিতে’ অস্থির ডিমের বাজার

আফিল গ্রুপের ডিম ১১ টাকা ৭০ পয়সা, কাজী গ্রুপের ১১ টাকা ২১ পয়সা ও পাবনা গ্রুপের ডিমের দাম পিসপ্রতি ১১ টাকা ৩০ পয়সা। এর সঙ্গে পিসপ্রতি ৫০ থেকে ৯০ পয়সা যোগ করে বিক্রি করছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ গ্রুপ ১১ টাকা ৯০ পয়সা, চাঁদ গ্রুপ ১১ টাকা ৭০ পয়সা, মেগা গ্রুপ ১১ টাকা ৯০ পয়সা ও সিপি বাংলাদেশ ১১ টাকা ৬০ পয়সা দামে পিস প্রতি ডিম সরবরাহ করছে। 


যশোরের বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে ফার্মের ডিমের দাম একলাফে আড়াই টাকা বেড়েছে। ফলে, সস্তার আমিষের উৎস হিসেবে পরিচিত এই পণ্যটিতে দামের কশাঘাত নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয়ে বাড়তি চাপ ফেলছে।
সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা উৎপাদন ব্যয়ের একটি হিসাব তুলে ধরে দাম বৃদ্ধিকে সংগতিপূর্ণ বলে ব্যাখ্যা দিলেও, অপর একটি সরকারি দপ্তর প্রধান ও প্রান্তিক খামারিরা এ মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন। 
তাঁদের অভিযোগ, ফার্মের ডিম উৎপাদনকারী করপোরেট গোষ্ঠী কারসাজি করে দাম বাড়ায়। এ ছাড়া ‘মিডিয়া’ অর্থাৎ খামার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্তদের ‘সিন্ডিকেট তৎপরতায়’ ডিমের দাম ওঠানামা বা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। 


ডিম বিপণন ব্যবস্থার ভাষায় মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটকে ‘মিডিয়া’ বলে। ডিম বিপণন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় ‘মিডিয়া’ ছাড়া বাজারে সরাসরি ডিম বিক্রি করতে পারেন না খামারির। ফলে পুঁজি-শ্রম বিনিয়োগ ও কষ্ট করে ডিম উৎপাদনকারী প্রান্তিক খামারিরা কখনই নিজেরা দাম নির্ধারণ করতে পারেন না।
এদিকে ক্রেতারা বলছেন, দামের উত্তাপে অনেকদিন ধরেই গরু-খাসির মাংসের পদ পাতে উঠছে না। একসময়ের সাশ্রয়ী পাঙাশ-তেলাপিয়ার দাম বাড়ায় প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস মাছও চলে গেছে নাগালের বাইরে। এবার কম দামে সহজলভ্য আমিষের উৎস ডিমেও লেগেছে দামের কশাঘাত।


খামারিরা বলছেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেলসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ, পোল্ট্রি ফিড ও ওষুধপত্রের দাম কিছুটা বাড়ায় অন্যান্য খাতের মতো পোল্ট্রি শিল্পেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় কিছুটা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। তারপরও এত চাপের মধ্যে খামার সচল রাখতে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে স্বল্প মুনাফা যোগ করে ডিম বিক্রি করছেন। 
কিন্তু বাজারে খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা। করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ‘মিডিয়া’ এক্ষেত্রে কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটছে। এতে খামারিরাও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আবার খুচরা ভোক্তার ওপরও চাপ পড়ছে।


খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত দিনগুলোর মতো আবারও বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিক প্রভাবের বাইরে খুচরা বাজারে ডিমের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার রায়পুর গ্রামের খামারি বিসমিল্লাহ এগ্রোর স্বত্বাধিকারী সাব্বির হোসেন জানান, লেয়ার ফিড বা পোল্ট্রি ফিডের দাম কেজিতে ২ টাকা ও বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রতিদিন জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় এখন বেশি হচ্ছে।
সাব্বির হোসেন দাবি করেন, বাজারে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া মিডিয়া (মধ্যস্বত্বভোগী) ডিমপ্রতি ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা লাভ করে। এতে খুচরা পর্যায়ে কয়েক হাত বদল হয়ে ডিমের দাম বেড়ে যায়। এই খামারির ভাষ্য, মিডিয়া ছাড়া বিক্রি করা যায় না। কয়েক হাজার ডিম যানবাহনে বয়ে নিয়ে বাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা নেই বলে এমনটি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে আরও যোগ করেন তিনি।
এই খামারি আরও জানান, তাঁর খামার থেকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা দামে ডিম কিনে যাচ্ছেন ফড়িয়ারা। আর সেই ডিম বাজারে ১৩-১৪ টাকায় বিক্রি হলে সেটি অযৌক্তিক দাম বলে মনে করেন তিনি।
সরেজমিনে যশোর শহরের নিত্যপণ্যের দোকান ঘুরে জানা গেছে, প্রতি পিস ডিম ১২ টাকা ৫০ পয়সা দামে বিক্রি হচ্ছে। গ্রামীণ বাজারগুলোয় প্রতি পিস ফার্মের ডিম ১৪ টাকাও নেওয়া হচ্ছে বলে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে। এদিকে, শহরের জেল রোডের আড়তগুলোতে ডিমের পাইকারি দাম আকারভেদে ১২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত।
ডিমের আড়ত ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সিরাজুল ইসলাম জানান, আফিল গ্রুপের ডিম ১১ টাকা ৭০ পয়সা, কাজী গ্রুপের ১১ টাকা ২১ পয়সা ও পাবনা গ্রুপের ডিমের দাম পিসপ্রতি ১১ টাকা ৩০ পয়সা। এর সঙ্গে পিসপ্রতি ৫০ থেকে ৯০ পয়সা যোগ করে বিক্রি করছেন।


বিসমিল্লাহ ডিম হাউজের মালিক আকরাম হোসেন পাপ্পু ও মায়ের দোয়া ডিম স্টোরের কর্ণধার শেখ কুদ্দুস আলী জানান, সিরাজগঞ্জ গ্রুপ ১১ টাকা ৯০ পয়সা, চাঁদ গ্রুপ ১১ টাকা ৭০ পয়সা, মেগা গ্রুপ ১১ টাকা ৯০ পয়সা ও সিপি বাংলাদেশ ১১ টাকা ৬০ পয়সা দামে পিস প্রতি ডিম সরবরাহ করছে। এই দামের সঙ্গে লভ্যাংশ যোগ করে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করবেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ডিমের বার্ষিক চাহিদা ৫১ কোটির ওপর। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৫৩ কোটি ডিম। এ জেলায় বর্তমানে ১৩০টি লেয়ার মুরগির খামার চালু রয়েছে।
তবে জেলায় চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলেও তার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। বরং উৎপাদন ও খুচরা দামের মধ্যে বড় ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এসেছে।
যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ডিম উৎপাদনকারী একটি মুরগির খাবারের পেছনে প্রতিদিন ব্যয় হয় ৯ টাকা ৮০ পয়সা। খামারের শতভাগ মুরগি ডিম দেয় না। গড়ে ৮০ শতাংশ ডিম দেয়। এছাড়া বাচ্চা কেনা, ওষুধ, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও শ্রমিকের খরচ মিলে আরও ১ টাকা ৮৪ পয়সা যোগ হয়। ফলে প্রতিটি ডিমের মোট উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ১১ টাকা ৫৪ পয়সা।


দামের চাপ, তদারকি নিয়ে প্রশ্ন :
স্বল্পদামের অন্যান্য প্রাণিজ আমিষের মতো ডিমের দাম বৃদ্ধিতে দৈনন্দিন বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষেরা। শহরের বড় বাজারে ডিম ক্রেতা উপশহরের সাজ্জাদ হোসেন জানান, সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। সস্তার পাঙাশ-তেলাপিয়াও নাগালের বাইরে। এবার বাড়ছে ডিমের দর। এতে প্রতিদিনের খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জীবনধারণ করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে, শহরের রেলবাজার এলাকায় আলাপচারিতায় আরেক ক্রেতা গৃহকর্মী জরিনা বেগম বলেন, বাচ্চাদের মাংস-মাছ খাওয়াতে পারি না। ঝোল ভাত খেতে চাইলে আগে ডিম সিদ্ধ করে আলু-ডিমের ঝোল করে দিতাম। সেটা না হলেও একটা ডিম ভাজা দিলে ভাত খেত। দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন সেই ডিমও কেনা কঠিন হয়ে গেল।
তবে এ ব্যাপারে সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা জানান, ডিমের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি পত্রের মাধ্যমে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অবগত করেছেন; যাতে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা যায়।


তিনি আরও জানান, ডিম উৎপাদনকারী যশোরের দুটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয়ের হিসাবপত্র যাচাই করার ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আহ্বান জানানো হয়েছে। এটা করা গেলে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় ও তাদের নির্ধারিত দামের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যাবে। ১০ টাকার ডিম হঠাৎ সাড়ে বারো টাকা কেন হলো, সেটি উদঘাটিত হবে। ডিম উৎপাদনে নিয়োজিত করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে ডিমের বাজার বেসামাল হচ্ছে বলে আরও যোগ করেন তিনি।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: