গাছ কাটা, বন্যপ্রাণী শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, প্লাস্টিক দূষণ, শিল্পবর্জ্য, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও জাহাজ চলাচল—মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে সুন্দরবনের ওপর বাড়ছে চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির নদী, খাল, মাটি, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী বহুমুখী ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব শুধু বনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উপকূলীয় জনপদ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পড়বে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ রয়েছে। তবে পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বনকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ডের চাপ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২৬ জুলাই আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস পালিত হলেও সুন্দরবনের ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
বনের কাছে শিল্পকারখানা
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, গত এক দশকে সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায় সিমেন্ট কারখানা, এলপি গ্যাস প্লান্ট ও অয়েল রিফাইনারিসহ প্রায় ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বনের কাছেই খাদ্য বিভাগের একটি বড় গুদামও নির্মাণ করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে ছোট নদী ও খালের মাধ্যমে দূষিত পানি সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। এতে পানি ও মাটির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক এলাকায় আগের মতো চারা গজাচ্ছে না। নদীর পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় জলজ প্রাণীর জন্যও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দেশে ১১ হাজারের বেশি প্রাণী প্রজাতির মধ্যে দুই হাজারের বেশি প্রজাতির দেখা মেলে সুন্দরবনে। এখানে রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এই জীববৈচিত্র্যের ওপরও বাড়ছে চাপ।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ ধরনের স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। মাছ ও উদ্ভিদের কয়েকটি প্রজাতিও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ
সুন্দরবনের কাছাকাছি শিল্পকারখানা, রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও রিসোর্টকে বনের ওপর বড় চাপ হিসেবে দেখছেন পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ, বনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল, জাহাজডুবি, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা ও বন্যপ্রাণী শিকারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সরকার সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকাকে অভয়ারণ্য এবং বনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করেছে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রও সুন্দরবনের ওপর চাপ তৈরি করছে। তার অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষিত পানি পরিশোধন না করে সুন্দরবনের মইদারা ও পশুর নদে ফেলা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া ও নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণেও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
কোলঘেঁষে গড়ে উঠছে রিসোর্ট
সুন্দরবনের আশপাশে কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে ওঠা নিয়েও পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। খুলনার দাকোপের কৈলাশগঞ্জ, ঢাংমারী ও বানিশান্তা, বাগেরহাটের মোংলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় সুন্দরবনের কাছাকাছি এসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও গাছ কেটে ও খাল ভরাট করে কটেজ-রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও জেনারেটর ব্যবহারের পাশাপাশি রাতে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সুন্দরবন এমনিতেই নানা কারণে বিপদের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বনের কোলঘেঁষে রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ নতুন উপদ্রব তৈরি করেছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ফজলুল হক বলেন, ‘বনের জন্য ক্ষতিকর কটেজ ও রিসোর্ট বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দুই লাখের বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটকবাহী লঞ্চ ও জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ, হাইড্রোলিক হর্ন, নিঃসৃত তেল ও অতিরিক্ত আলো বনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শিকারিদের থাবা
সুন্দরবনে বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শিকারের ঘটনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাঘ সংরক্ষণে কাজ করা ব্যক্তিদের অভিযোগ, চোরাশিকারিরা বাঘের চামড়া, হাড় ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারের সঙ্গে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বাঘ শিকারে একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে।
হরিণ শিকারও সুন্দরবনের দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাশাপাশি কুমির, সাপ, তক্ষক ও কচ্ছপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাচারের উদ্দেশ্যে শিকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও তা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে মাংসসহ হরিণ শিকারিদের আটক করা হচ্ছে।’
বিষ দিয়ে মাছ ধরা
সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগও রয়েছে। এতে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনার সিভিল সার্জন মাহফুজা খাতুন বলেন, বিষাক্ত পানির মাছ খেলে মানুষের পেটের পীড়াসহ কিডনি ও লিভারের ক্ষতি হতে পারে। এতে ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনা কমেছে বলে দাবি করেন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সারা বছরই সুন্দরবনে বন বিভাগের নিয়মিত ও জোরালো টহল অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
গাছ কাটার অভিযোগ
সুন্দরবনের গভীরেও গাছ কাটার চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কেউ কেউ সুযোগ নিয়ে গাছ কেটে নিয়ে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এরপরও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা কাজ করছেন। বিভিন্ন সময় কীটনাশক, বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ জাল, হরিণ শিকারের ফাঁদ ও মাংসসহ শিকারিদের আটক করা হচ্ছে।’
বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন থেকে গাছ কাটার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে বন বিভাগ, র্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করছে। বন্যপ্রাণী ও বনজ সম্পদ পাচার বন্ধে সুন্দরবনে প্রবেশ ও বের হওয়ার নদী-খালের মুখে টহল জোরদার করা হয়েছে।’
জাহাজ চলাচলেও বাড়ছে ঝুঁকি
বঙ্গোপসাগর থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ পশুর নদ দিয়ে নিয়মিত জাহাজ চলাচল করে। এ ছাড়া কালিঞ্চি, রায়মঙ্গল, কাচিকাটা, আড়পাঙ্গাশিয়া, বজবজা, আড়ুয়া শিবসা, শিবসা ও পশুর নদ দিয়েও বিভিন্ন জলযান চলাচল করে।
বনের ভেতর দিয়ে ছোট-বড় জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে জাহাজডুবির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় তেল ও রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
মোংলার পরিবেশকর্মী নূর আলম শেখ বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ন বন্যপ্রাণীকে আতঙ্কিত করে। জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেল ও বর্জ্য বনের পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জলযানের পাখার আঘাতেও ডলফিনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।’
প্লাস্টিক দূষণের চাপ
সুন্দরবনের মাটি ও পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সুন্দরবনের নৌপথে চলাচলকারী জলযান থেকে পলিথিন, চিপস, চানাচুর, বিস্কুটের প্যাকেট, পানির বোতল, প্লাস্টিকের কাপ, গ্লাস ও প্লেট ফেলা হচ্ছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘বনসংলগ্ন ৮০টি গ্রাম থেকে ৫২টি নদী-খালের মাধ্যমে জোয়ারের পানিতে প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করছে।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণাতেও সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত ওই গবেষণায় সুন্দরবনের ছয়টি স্থানের পানি ও মাটি পরীক্ষা করা হয়। এতে প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ২ দশমিক ২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং প্রতি কেজি মাটিতে গড়ে ৭৩৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণের কারণে সুন্দরবনের স্থল ও জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদের ওপর হুমকি বাড়ছে। মাছের মাধ্যমে প্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের শরীরেও পৌঁছাতে পারে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।’
বন বিভাগের দাবি, বাড়ছে প্রাণী ও উদ্ভিদ
সুন্দরবনের ওপর নানা হুমকি ও উদ্বেগের মধ্যেও বনটির উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে বলে দাবি করেছেন সুন্দরবনের প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে সার্বিকভাবে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরিমাণ বেড়েছে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাঘের খাদ্য হিসেবে বিবেচিত প্রাণীর সংখ্যাও বেড়েছে।’
সুন্দরবন রক্ষায় বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ কাজে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।


























