যশোর শহরের পুরোনো ভবনগুলোর একটি যশোর পুলিশ সুপারের পুরোনো কার্যালয়। কয়েক বছর আগে পুলিশ সুপারের কার্যালয়টি পাশের নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু পুরোনো ভবনটি আজও দাঁড়িয়ে আছে যশোরের প্রশাসনিক ও পুলিশি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে।
ভবনটির দেয়ালে উৎকীর্ণ একটি তারিখ ২৯ এপ্রিল ১৮৬৩। অর্থাৎ আজ থেকে ১৬৩ বছর আগে এই ভবনের উদ্বোধন হয়েছিল। সময়ের হিসাবে দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যশোরে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার বিকাশ, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস।
যশোর ব্রিটিশ ভারতের প্রাচীনতম জেলাগুলোর একটি। ১৭৮৬ সালে এ জেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। এর প্রথম কালেক্টর ছিলেন টিলম্যান হেঙ্কেল। তখনকার যশোর বর্তমান জেলার সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, ইশপপুর ও সৈয়দপুর পরগনার পাশাপাশি চাঁচড়া রাজ্য এবং বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ মহকুমার ইছামতী নদীর পশ্চিম সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকা যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এত বিস্তৃত এলাকায় প্রশাসন পরিচালনা ছিল কঠিন কাজ। বিশেষ করে ডাকাতি, দস্যুতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল বড় সমস্যা। সে সময় মুর্শিদাবাদের নাজিম বা নবাবের অধীনে মুরলী ও ভূষণায় দুজন দারোগা দায়িত্ব পালন করতেন। কয়েকশ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে তাদের দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ডাকাতি প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা।
কিন্তু সেই পুরোনো ব্যবস্থা সবসময় কার্যকর ছিল না। দারোগাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় যশোরে নতুন ধরনের পুলিশ ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে টিলম্যান হেঙ্কেলের ভূমিকা।
হেঙ্কেল ১৭৮১ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত যশোরের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১৭৮১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে- মতান্তরে ৭ জুন- মুরলীতে আসেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রচলিত পুলিশ ব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর কাছে দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায়, শুধু পুরোনো কাঠামো দিয়ে এত বিশাল এলাকার দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তখন যশোরে চারটি থানা ছিল- ভূষণা, মির্জানগর, নয়াবাদ ও ধরমপুর। ভূষণা ছিল বর্তমান মাগুরার মহম্মদপুর এবং ফরিদপুরের মধুখালী ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। মির্জানগর ছিল বর্তমান কেশবপুর অঞ্চলে, নয়াবাদ বর্তমান খুলনা এলাকায় এবং ধরমপুর ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট একটি থানা। এসব থানার অধীনে ছিল একাধিক চৌকি।
থানাগুলোতে বেতনভুক্ত কর্মকর্তা থাকলেও চৌকিগুলো পরিচালিত হতো গোয়েন্দা বা ইনফর্মারদের মাধ্যমে। তাদের নির্দিষ্ট বেতন ছিল না। ফলে জীবিকার তাগিদে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে অর্থ আদায়ের মতো অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যে ব্যবস্থা মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারত মানুষের ভোগান্তির কারণ।
এর মধ্যে যশোরের আরেক ভয়াবহ বাস্তবতা ছিল দস্যুতা। হেঙ্কেল যখন জেলার দায়িত্ব নেন, তখন প্রায় ৫০টি শক্তিশালী দস্যুদল যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াত বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা সুযোগ পেলেই বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি ও লুটতরাজ চালাত। ফৌজদাররা দস্যুতা দমনে কিছু ব্যবস্থা নিলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
এই পরিস্থিতিতে হেঙ্কেল মূলত পুলিশ ব্যবস্থার জনবল ও কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, প্রতিটি থানায় একজন করে পুলিশ প্রধান থাকবেন। তাঁর প্রধান দায়িত্ব হবে ডাকাত ও দস্যুদের গ্রেপ্তার করা এবং তাদের মুরলীর আদালতে হাজির করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জায়গাটি ছিল পুলিশ সদস্য নির্বাচন। আগের মতো অনিয়মিত গোয়েন্দা বা ইনফর্মারদের ওপর নির্ভর না করে তাঁদের অধীনে থাকবে এমন লোক, যারা বাস্তবে দস্যুদের মোকাবিলা করতে সক্ষম। তারা হবে বিদেশি সিপাহী অথবা দেশীয় বরকন্দাজ- অর্থাৎ প্রশিক্ষিত ও অস্ত্রধারী এমন জনবল, যারা প্রয়োজনে অপরাধীদের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করতে পারবে।
হেঙ্কেলের প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করলে মুরলীতে ৫০ জন সিপাহির একটি দল পাঠানো হয়। পাশাপাশি ভূষণা ও মির্জানগরে ৩০ জন করে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট থানা ধরমপুরে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নয়াবাদে একই ধরনের বাহিনী দেওয়া হয়েছিল কি না, তার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
এই উদ্যোগ যশোরে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সংগঠিত, বেতনভুক্ত এবং দায়িত্বশীল বাহিনী গঠনের যে চিন্তা তখন সামনে আসে, তা পরবর্তী সময়ে জেলার পুলিশ প্রশাসনের ভিত্তি শক্ত করে।
আজ সেই ইতিহাসের অনেকটাই আমাদের চোখের আড়ালে। শহর বদলেছে, প্রশাসনিক কাঠামো বদলেছে, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ও নতুন ভবনে চলে গেছে। কিন্তু পুরোনো ভবনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার দেয়ালে ২৯ এপ্রিল ১৮৬৩-এর সেই তারিখটি যেন সময়ের কাছে রেখে যাওয়া এক দলিল।
১৬৩ বছর আগে যে ভবনের দরজা খুলেছিল, তার ভেতর দিয়ে হেঁটেছেন কত কর্মকর্তা, কত পুলিশ সদস্য, কত মানুষ- তার হিসাব নেই। কত অভিযোগ, কত মামলা, কত মানুষের কান্না, কত স্বস্তির নিঃশ্বাস যে এই ভবনের দেয়াল শুনেছে, তারও কোনো লিখিত ইতিহাস নেই।
তবু ভবনটি নিজেই একটি ইতিহাস। কারণ যশোরের পুলিশ প্রশাসনের বর্তমান কাঠামোর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। টিলম্যান হেঙ্কেলের সময়ের দারোগা ও বরকন্দাজ থেকে আজকের আধুনিক পুলিশ প্রশাসন- এই দীর্ঘ পথের কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে যশোরের সেই পুরোনো পুলিশ সুপারের কার্যালয়।


























