মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬

২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৈত্রী-বন্ধন-মিতালী ফের চালু হচ্ছে

রানার ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:২২, ১৮ আগস্ট ২০২৬

মৈত্রী-বন্ধন-মিতালী ফের চালু হচ্ছে

দীর্ঘ বিরতির পর ফের চালু হতে যাচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনগুলো। ইতোমধ্যে উভয় দেশের পক্ষ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেছে। পুনরায় রেল যোগাযোগ শুরু করতে দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য শিগ্গিরই ঢাকায় আসছে ভারতীয় রেলের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।

জানা যায়, পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণ করেন। এক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ রেল। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। তিক্ততার এক পর্যায়ে উভয় দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। উভয় পক্ষে তিক্ত বাক্যবিনিময়ও হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এর পরপরই মূলত দৃশ্যপটে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে উভয় দেশের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুদেশের মধ্যে জনপ্রিয় রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, বন্ধ রেলযোগাযোগ পুনরায় চালু হলে উভয় দেশের জনগণ উপকৃত হবেন। নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী যোগাযোগের জন্য রেলের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিগ্গিরই হয়তো উভয় দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ ফের চালু হবে।

সূত্র জানায়, গণ-অভ্যুথানের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা ২৮ জুন থেকে পুনরায় চালু করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলোয় এই আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভিসা দেওয়া হচ্ছে। ভিসাপ্রাপ্তদের অনেকেই বলছেন, বিমান বা সড়ক যাত্রার তুলনায় ট্রেন ভ্রমণ অনেক আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী। দুদেশের মধ্যে চলা ট্রেনগুলোর প্রশস্ত আসন ও চলাফেরার স্বাধীনতার কারণে দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্তি কম হয়। এছাড়া এর সাশ্রয়ী ভাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রথম পছন্দ হলো আন্তর্দেশীয় রেল যোগাযোগ।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২০ থেকে ২২ জানুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে ৩৭তম আন্তঃসরকারি রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম) অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ভারতীয় রেলের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে দুদেশের মধ্যে রেলের উন্নয়নের নানা বিষয়ের মধ্যে বন্ধ থাকা তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর কথা গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে বলা হয়, যে কোনো সময় ট্রেন তিনটি চালাতে বাংলাদেশ রেল প্রস্তুত রয়েছে। আর ভারতীয় রেলওয়ের বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে ট্রেন তিনটি কয়েক মাসের মধ্যেই চালুর বিষয়ে জানানো হবে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, দুদেশের মধ্যে চলা ট্রেন তিনটিতে যাত্রী চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২৫-৩০ দিন আগেই টিকিট বিক্রি হয়ে যেত। রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগই বাংলাদেশ রেল পেত। ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আইজিআরএম-এর বৈঠক হতে যাচ্ছে। ওই বৈঠকে দুদেশের রেলওয়ে বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। ট্রেন তিনটি দ্রুত চালুর পাশাপাশি রেলের উন্নয়নে নানা বিষয় উঠে আসবে বৈঠকে। ট্রেন চালাতে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। ভারতের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ বললেই হয়। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন-এমনটা শোনা যাচ্ছে। ওই সফরেও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তখন আর কোনো সমস্যাই থাকবে না।

এদিকে বিশেষ সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে তিনটি ট্রেন পুনরায় চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে ভারতীয় রেল মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা রেল বোর্ডকে জানানোর কথাও বলা হয়েছে। ঢাকায় অবস্থিত ভারতের হাইকমিশনের তরফ থেকে ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করার অনুরোধও পাঠানো হয়েছে ভারতীয় রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পাওয়া যাচ্ছে, ফলে আবার দুদেশের মধ্যে বন্ধ থাকা ট্রেনগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যেই চালু হবে-এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।

রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহণ দপ্তর সূত্রের খবর, দুদেশের মধ্যে চলা তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেনসহ মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় বছরে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা বাংলাদেশ রেল আয় করে। বিশেষ করে গত ২ বছর যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেল। আন্তর্দেশীয় রেল যোগাযোগ সাশ্রয় ও নিরাপদ-এমনটা জানিয়ে রেলওয়ে বাণিজ্যিক দপ্তর বলছে, রেলপথে ভারত ভ্রমণে সাধারণ মানুষ সব সময়ই আগ্রহে থাকেন। ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেসে ২৭৪০, ঢাকা-জলপাইগুড়ি এক্সপ্রেসে ৩০১৫ এবং খুলনা-কলকাতা এক্সপ্রেসে ১৩৭০ টাকায় ভ্রমণ করা যেত। কিন্তু ২ বছর ধরে ট্রেনগুলো বন্ধ থাকায় সাশ্রয়ী মূল্যে ভারত ভ্রমণ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ভারতে ভ্রমণকারী (মেডিকেল ভিসাসহ যাবতীয় ভিসা) সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে বিমানে ভ্রমণ করছেন। এদিকে দুদেশের মধ্যে ট্রেন চলাচলে বিভিন্ন ইস্যুর সুযোগ তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট রেলওয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে বিমান পরিচালনাকারীদের অবৈধ লেনদেন ও যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। ভারতের পক্ষ থেকে সম্মতি দিলেই ট্রেন চালাতে পারব। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই আন্তর্দেশীয় রেলযোগাযোগ চালু হবে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্দেশীয় ট্রেন চলাচলে আয় অনেক বেশি। আশা করছি দুদেশের সরকারের সমন্বয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যেই বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো চালু হবে। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, ট্রেনগুলো চালু হলে ভিসা দেওয়ার সংখ্যা বাড়বে। ট্রেনে বাংলাদেশ ভ্রমণ ভারতীয় নাগরিকদের জন্যও খুব স্বস্তির।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: