মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬

৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেনারেটরের আলো থেকে  জাতীয় গ্রিডে যশোর

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৫৭, ২৪ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৩:৫৮, ২৪ আগস্ট ২০২৬

জেনারেটরের আলো থেকে  জাতীয় গ্রিডে যশোর

একসময় যশোর শহরের রাতের অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব ছিল একটি জেনারেটরের ওপর। আজকের মতো তখন ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো ছিল না, ছিল না জাতীয় গ্রিডের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। শহরের চিত্রামোড়ের বিদ্যুৎ অফিসে স্থাপিত একটি ৫০০ কিলোওয়াটের জেনারেটরই ছিল যশোরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসা। জার্মানিতে তৈরি সেই জেনারেটরটি বহুদিন যশোরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। পরে সেটি বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সেই সময়ের যশোরকে আজকের চোখে কল্পনা করলে বিদ্যুতের সেই সীমিত ব্যবস্থা যেন এক ভিন্ন সময়ের গল্প বলে। জেনারেটর চালু হলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরকারি স্থাপনায় আলো জ্বলত। কালেক্টরের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সিভিল সার্জনের দপ্তর, হাসপাতাল, কারাগারসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। শহরের কিছু সড়কেও বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলত। ফলে রাতের যশোর তখন পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে থাকত না।

তবে বিদ্যুৎ তখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বিষয় হয়ে ওঠেনি। বাসাবাড়িতে সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও নানা বিধিনিষেধ ছিল। বিশেষ করে দালান বাড়ি না হলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হতো না- এমন স্মৃতিও রয়েছে সেই সময়ের যশোরবাসীর মধ্যে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ তখন প্রয়োজনের পাশাপাশি ছিল সামর্থ্য ও সামাজিক অবস্থানেরও একটি পরিচায়ক।

যশোরের এই বিদ্যুৎ-ইতিহাসকে বুঝতে হলে পুরো বঙ্গ অঞ্চলে বিদ্যুতের আগমনের ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকাতে হয়। বাংলায় বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছিল মূলত অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে। ঢাকায় ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর আহসান মঞ্জিলে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের সূচনা হয়। পরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অভিজাত ভবনগুলোও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আসে।
শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিস্তার অবশ্য একদিনে ঘটেনি। ১৯৩১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা পৌর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করে। তার আগে শহরের রাস্তায় বাতি জ্বলত কেরোসিনে। এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন পূর্ব বাংলার শহরগুলোতে বিদ্যুৎ ধীরে ধীরে পৌর ও বাণিজ্যিক জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছিল বিচ্ছিন্ন ও সীমিত। সে সময় ১৭টি জেলার শহরাঞ্চলে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। অধিকাংশ জায়গায় নির্দিষ্ট সময়, বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ দেওয়া হতো। তখন এ অঞ্চলের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র প্রায় ২১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যশোরের সেই ৫০০ কিলোওয়াটের জেনারেটরের গুরুত্ব বুঝতে অসুবিধা হয় না। একটি সীমিত ক্ষমতার যন্ত্র দিয়ে তখন একটি জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারাগার এবং কিছু সড়ক আলোকিত রাখা ছিল নিঃসন্দেহে বড় আয়োজন। আজকের বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্রের যুগে সেই ব্যবস্থা হয়ত খুবই ছোট মনে হবে; কিন্তু তখন সেটিই ছিল আধুনিকতার প্রতীক।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর যশোরসহ পূর্ব পাকিস্তানের শহরাঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকে। ১৯৪৮ সালে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বিদ্যুৎ অধিদপ্তর গঠন করে। পরবর্তী সময়ে, সরকার একাধিক বেসরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
যশোরের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনের সময়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পঞ্চাশের দশকের শুরু পর্যন্ত বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল বলে পুরোনো তথ্য থেকে জানা যায়। ১৯৫১ সালে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ওই মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ওয়াপডা বা পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এটি পাকিস্তান সরকার ১৯৫৮ সালে গঠন করে। পরবর্তী বছর, ১৯৫৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ এবং পানি সম্পদ উন্নয়নকে বৃহত্তর সরকারি কাঠামোর অধীনে আনা হয়।
ওয়াপডার কাজ ছিল মূলত দুটি বড় ধারায় বিভক্ত- পানি সম্পদ উন্নয়ন ও সেচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ। এর ফলে বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের যুগ থেকে ধীরে ধীরে বৃহত্তর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান।

১৯৪৭ সালের পর যশোরবাসী যে গ্রিডের বিদ্যুতের স্বাদ পেয়েছিল বলে স্থানীয় স্মৃতিতে উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটি ছিল সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। জেনারেটরের সীমিত আলো থেকে গ্রিডের বিদ্যুতে যাত্রা মানে শুধু বিদ্যুৎ পাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি ছিল একটি শহরের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সূচনা। সরকারি অফিসের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়তে থাকে।

এরপর আসে স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ৩১ মে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে সাবেক ওয়াপডার বিদ্যুৎ অংশ পৃথক করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর দায়িত্ব ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের সমন্বিত উন্নয়ন।
আজ যশোর শহরের আকাশে অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার, উপকেন্দ্র, বৈদ্যুতিক বাতি, দোকানের আলোকসজ্জা কিংবা ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দেখে সেই পুরোনো দিনের কথা মনে করা কঠিন। অথচ এই শহরও একদিন একটি মাত্র জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে রাতের আলো জ্বালাত। চিত্রামোড়ের সেই বিদ্যুৎ অফিসে দাঁড়িয়ে থাকা জার্মানির তৈরি ৫০০ কিলোওয়াটের যন্ত্রটি আজ নেই। বিক্রি হয়ে গেছে বহু আগেই। তার শব্দও আর শোনা যায় না চিত্রামোড়ে। কিন্তু তার আলো যেন থেকে গেছে যশোরের স্মৃতিতে। 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: