আজ বিরিয়ানি বাঙালির কাছে শুধু মোগলাই খাবার নয়, এটি যেন উৎসব, বিয়ে, ঈদ কিংবা পারিবারিক আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঢাকার কাচ্চি, কলকাতার আলু দেওয়া বিরিয়ানি কিংবা মুর্শিদাবাদ-নবাবি ঘরানার নানা পদ- সব মিলিয়ে বিরিয়ানি এখন বাংলার খাদ্য সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু এই খাবার কি আদৌ বাঙালির নিজস্ব? নাকি বহু দূরদেশ থেকে এসে ধীরে ধীরে বাংলার মাটি ও মানুষের স্বাদে মিশে গেছে? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিরিয়ানির শিকড় বাংলায় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারস্য, মধ্য এশিয়া, মুঘল দরবার এবং উত্তর ভারতের দীর্ঘ খাদ্য-ভ্রমণের ইতিহাস।
বিরিয়ানির উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদ ও খাদ্য-গবেষকদের মধ্যে পুরোপুরি একমত কোনো মত নেই। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয়, চাল, মাংস, ঘি ও সুগন্ধি মশলার সমন্বয়ে তৈরি এই ধরনের খাবারের শিকড় পারস্য ও মধ্য এশিয়ার রান্নার ঐতিহ্যে। ‘বিরিয়ানি’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়েও মতভেদ রয়েছে। পারসিক ‘বিরিয়ান’ শব্দের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা বলা হয়, যার অর্থ রান্নার আগে ভেজে নেওয়া। দক্ষিণ এশিয়ায় এসে এই খাবার মুঘল দরবার, রাজকীয় রান্নাঘর এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও সামরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে নানা রূপ লাভ করে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- চাল ও মাংস একসঙ্গে রান্না করার ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশে বিরিয়ানির আগেও ছিল। প্রাচীন তামিল সাহিত্যে ‘ওন সোরু’ নামে চাল ও মাংসের একটি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে সেটিকে সরাসরি আজকের বিরিয়ানি বলা ঠিক হবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় চাল-মাংসের রান্নার একটি পুরোনো ঐতিহ্য ছিল, যার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে পারসিক-মুঘল রান্নার মিশ্রণে আধুনিক বিরিয়ানির বিভিন্ন রূপ গড়ে ওঠে।
বাংলায় বিরিয়ানির প্রবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় মুঘল আমলে। ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে দিল্লি, উত্তর ভারত ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সৈন্য, কারিগর ও তাঁদের পরিবার ঢাকায় আসে। তাঁদের সঙ্গে আসে রাজদরবারের নানা রকম খাবার ও রান্নার কৌশল। খাদ্য-ইতিহাসের বিভিন্ন বিবরণে বলা হয়েছে, এই সময় মুঘল কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বাবুর্চিদের হাত ধরে বিরিয়ানিও ঢাকার অভিজাত মহলে প্রবেশ করে।
অর্থাৎ, বাংলায় বিরিয়ানির আগমনকে যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়, তাহলে সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধ, বিশেষ করে ১৬১০ সালের পরের ঢাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তখন অবশ্য বিরিয়ানি সাধারণ মানুষের খাবার ছিল না। এটি ছিল রাজপরিবার, সুবাদার, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিত্তবান মুসলিম পরিবারের ভোজের খাবার। ঢাকার মুঘল রাজধানী হয়ে ওঠার ফলে পারস্য-মধ্য এশীয় ও উত্তর ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয় বাংলার খাদ্যরীতির যোগাযোগ দ্রুত বাড়তে থাকে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই রাজকীয় খাবার অভিজাত অন্দরমহলের গণ্ডি পেরিয়ে ধীরে ধীরে শহুরে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাবুর্চিরা নিজেদের উপকরণ, স্বাদ ও রান্নার কৌশল যুক্ত করতে থাকেন। এভাবেই বাংলার বিরিয়ানি আর কেবল উত্তর ভারতীয় বা পারসিক রান্নার অনুকরণে থাকেনি; বরং স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
কাচ্চি বিরিয়ানির ক্ষেত্রে মাংস ও চালকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে ‘দম’-এ রান্না করার পদ্ধতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাংস আগে রান্না করা হয় না; মেরিনেট করা কাঁচা মাংসের ওপর চাল দিয়ে পাত্র বন্ধ করে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। এই পদ্ধতির সঙ্গে আওধ বা লখনউয়ের রান্নার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক খাদ্য-ইতিহাসভিত্তিক গবেষণায় ১৬১০ সালের পর ঢাকায় মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে উত্তর ভারতীয় বাবুর্চিদের আগমনের বিষয়টি কাচ্চির বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে আজকের ঢাকাই কাচ্চি সপ্তদশ শতকের রান্নার হুবহু অনুলিপি নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী স্থানীয় রাঁধুনিরা এর স্বাদ বদলেছেন। মাংস, চাল, আলু, ঘি, দই, কেওড়া, জাফরান ও নানা মসলার ব্যবহার ঢাকাই কাচ্চিকে নিজস্ব চরিত্র দিয়েছে। এ কারণে ঢাকার কাচ্চিকে শুধু ‘মুঘলাই খাবার’ বললে এর স্থানীয় বিবর্তনের ইতিহাসটি ধরা পড়ে না। এটি মূলত মুঘল-আওধি রান্নার সঙ্গে ঢাকার স্থানীয় খাদ্য রীতির দীর্ঘ মেলবন্ধনের ফল।
ঢাকায় বিরিয়ানি জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণ। পুরান ঢাকার খাদ্য সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি তখন ক্রমেই শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ১৯৩৯ সালে হাজী গোলাম হোসেনের হাত ধরে ‘হাজীর বিরিয়ানি’র যাত্রা শুরু হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। এরপর পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিরিয়ানির দোকান গড়ে উঠতে থাকে। বিরিয়ানি ধীরে ধীরে রাজকীয় ভোজের খাবার থেকে সাধারণ মানুষের নাগালের জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হয়।
বাংলার অন্য প্রান্তে বিরিয়ানির ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি হয় কলকাতায়। ঢাকার সঙ্গে কলকাতার বিরিয়ানির ইতিহাস এক নয়। কলকাতায় বিরিয়ানি জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান সূত্রটি যুক্ত অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের সঙ্গে। ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে কলকাতায় নির্বাসনে পাঠায়। তিনি মেটিয়াবুরুজে বসতি গড়ে তোলেন এবং তাঁর সঙ্গে আসে আওধের সংস্কৃতি, সংগীত, পোশাক এবং রাজকীয় রান্নার ঐতিহ্য। তাঁর বাবুর্চিরাও কলকাতায় এসে রান্না করতে থাকেন।
এই মেটিয়াবুরুজেই আওধি বিরিয়ানি কলকাতার স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে নতুন রূপ পেতে শুরু করে। কলকাতা বিরিয়ানির সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে বড় টুকরো আলু এবং অনেক ক্ষেত্রে ডিমের ব্যবহার। প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা হলো, নবাবের নির্বাসিত জীবনে আর্থিক সংকটের কারণে মাংসের পরিমাণ কমিয়ে আলু যোগ করা হয়েছিল। তবে খাদ্য-ইতিহাসে আলু ব্যবহারের কারণ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে; তাই ‘মাংসের বদলে আলু’ গল্পটিকে একেবারে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে না দেখাই ভালো।
কলকাতার বিরিয়ানির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- এটি লখনউয়ের বিরিয়ানির হুবহু অনুকরণ হয়ে থাকেনি। কলকাতার জলবায়ু, স্থানীয় উপকরণ, বাঙালি ও শহুরে খাদ্যরুচি এবং মেটিয়াবুরুজের নবাবি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এর স্বাদ ও চরিত্র আলাদা হয়ে যায়। ফলে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার পশ্চিমাংশেও বিরিয়ানি নতুন এক স্থানীয় পরিচয় লাভ করে।
তাহলে প্রশ্নটির উত্তর কী- বিরিয়ানি কবে বাঙালির খাবার হলো? এর কোনো একদিনের উত্তর নেই। বাংলায় এর প্রবেশ ঘটে মূলত মুঘল আমলে, বিশেষ করে ১৬১০ সালের পর ঢাকাকে মুঘল বাংলার রাজধানী করার সময়। প্রথমে এটি ছিল রাজদরবার ও অভিজাতদের খাবার। পরে স্থানীয় বাবুর্চি, ব্যবসায়ী, শহুরে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের হাত ধরে এটি বাংলার খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। কলকাতায় ১৮৫৬ সালের পর ওয়াজিদ আলি শাহের আওধি দরবারের প্রভাব বিরিয়ানিকে আরও একটি স্বতন্ত্র বাংলা রূপ দেয়। আর বিশ শতকে পুরান ঢাকার কাচ্চি ও কলকাতার আলু দেওয়া বিরিয়ানি তাকে জনমানুষের খাবারে পরিণত করে।
আজকের বাঙালি বিয়েবাড়িতে বিরিয়ানির বড় হাঁড়ি বসে, ঈদের সকালে বা দুপুরে কাচ্চির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে মহল্লাজুড়ে, আবার কলকাতায় বিরিয়ানির সঙ্গে আলুর সম্পর্ক নিয়ে রীতিমতো আবেগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বিরিয়ানি বাংলায় এসে শুধু টিকে থাকেনি- বাংলার মানুষের স্বাদে নিজেকে বদলে নিয়েছে। পারস্যের চাল-মাংসের ঐতিহ্য, মুঘল দরবারের রন্ধনশৈলী, আওধের বাবুর্চিদের কৌশল এবং বাংলার স্থানীয় খাদ্যরুচির দীর্ঘ মেলবন্ধনে যে খাবারটি তৈরি হয়েছে, সেটিই আজ বাঙালির বিরিয়ানি।
তাই বিরিয়ানিকে ‘বিদেশি খাবার’ বলে দূরে সরিয়ে রাখার সুযোগ নেই, আবার একে আদি বাঙালি খাবার বলাও ইতিহাসসম্মত হবে না। বরং বলা যায়- বিরিয়ানি বাংলায় এসেছিল বাইরে থেকে, কিন্তু কয়েক শতকের অভিযোজন ও ভালোবাসায় সেটি বাঙালির হয়ে গেছে।


























