শুক্রবার ২১ আগস্ট ২০২৬

৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলীনের পথে ৩০০ বছরের নোয়ানী  জমিদার বাড়ির ব্রহ্মময়ী কালী মন্দির

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:৪০, ২০ আগস্ট ২০২৬

বিলীনের পথে ৩০০ বছরের নোয়ানী  জমিদার বাড়ির ব্রহ্মময়ী কালী মন্দির

কেশবপুর উপজেলার চালিতাবাড়িয়া গ্রামের প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো নোয়ানী জমিদার বাড়ির ব্রহ্মময়ী কালী মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এখন বিলীনের পথে। কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় ৪ শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন এই মন্দিরের ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ। যে কোনো সময় এটি ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। অথচ ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি এখনও এই মন্দিরকে ঘিরে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলছে।


কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে চালিতাবাড়িয়া গ্রামে মন্দিরটির অবস্থান। কেশবপুর বাজার থেকে ত্রিমোহিনীর দিকে যেতে জাহানপুর থেকে দক্ষিণে বুড়ি ভদ্রা নদী পার হলেই চোখে পড়ে প্রাচীন এই স্থাপনাটি। একসময় নোয়ানী জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মন্দিরটি। সময়ের পরিক্রমায় জমিদারি প্রথা বিলীন হয়েছে, বদলে গেছে চারপাশের পরিবেশ। কিন্তু মন্দিরটি এখনও বহন করে চলেছে অতীতের স্মৃতি।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, চালিতাবাড়িয়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ভালুকঘর, শ্রীরামপুর, জাহানপুর ও সাতবাড়িয়া গ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে পূজা-অর্চনা করে আসছেন। প্রতিবছর জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় কালীপূজা। এছাড়া প্রতি মঙ্গলবার মন্দির প্রাঙ্গণে হরিসভার আয়োজন করা হয়। ফলে জরাজীর্ণ হলেও ধর্মীয়ভাবে মন্দিরটির গুরুত্ব এখনও কমেনি।


প্রাচীন স্থাপত্যের নানা নিদর্শনও মন্দিরটিতে এখনও দৃশ্যমান। তিন কক্ষবিশিষ্ট মন্দিরটির পশ্চিম পাশে রয়েছে তিনটি সদর দরজা। ভেতরের মূল মন্দিরে প্রবেশের জন্য রয়েছে আরও একটি দরজা। মন্দিরের দুই পাশে দুটি কামরা ও দুটি জানালার চিহ্ন এখনও টিকে আছে। স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশ দেখে স্থানীয়দের ধারণা, মন্দিরটি একসময় পোড়ামাটির নান্দনিক কারুকার্যে সজ্জিত ছিল। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে সেই কারুকার্যের অধিকাংশই এখন হারিয়ে গেছে।


মন্দিরের পাশে থাকা একটি শিবমন্দির ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ব্রহ্মময়ী কালী মন্দিরটিও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। মন্দিরের উত্তরে রয়েছে প্রায় ৪ বিঘা আয়তনের একটি বড় দিঘি। প্রাচীন মন্দির, দিঘি এবং আশপাশের পরিবেশ মিলিয়ে স্থানটি স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে উঠেছে।


স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর ধরে মন্দিরটির যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ হয়নি। ফলে দেয়াল ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে ভবনটির ক্ষয় আরও বাড়ে। জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটি কখন ধসে পড়ে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।


মন্দির কমিটির সভাপতি শম্ভু দেবনাথ, সম্পাদক বিকাশ কুমার নাগ ও সাংগঠনিক সম্পাদক গোপালচন্দ্র পাল জানান, প্রাচীন এই মন্দিরটি সংস্কারের জন্য তারা বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, মন্দিরটির ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর মন্দিরটি পরিদর্শন করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে প্রায় তিন শতাব্দীর পুরোনো ব্রহ্মময়ী কালী মন্দিরটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে নয়, কেশবপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবেও টিকে থাকতে পারে। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: