রোববার ৩০ আগস্ট ২০২৬

১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুঠিপাড়ার মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছেন দুই ইংরেজ নীলকর

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:০৭, ২৯ আগস্ট ২০২৬

কুঠিপাড়ার মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছেন দুই ইংরেজ নীলকর

কে এখানে শুয়ে আছেন, তাঁদের নাম কেউ জানেন না। শুধু এটুকুই জানা যায়- তাঁরা ছিলেন ইংরেজ, নীলকরদের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। চৌগাছার কুঠিপাড়ার মানুষজনের কেউ কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন দুই ভাই। কিন্তু সেই কথার পেছনে দলিল নেই, নেই কোনো শিলালিপি, নেই পরিচয়ের ফলক। ইতিহাসের পাতা থেকেও যেন ধীরে ধীরে মুছে গেছে তাঁদের নাম।

কপোতাক্ষ নদের তীরে চৌগাছার কুঠিপাড়া। একসময় যেখানে নীলের কারবার ঘিরে ব্যস্ততা ছিল, সেখানে আজ ইতিহাসের একটি ক্ষয়িষ্ণু অধ্যায় পড়ে আছে ইটের সমাধির নিচে। পাশাপাশি কিংবা কাছাকাছি থাকা সেই পুরোনো সমাধিগুলো এখন ভেঙে পড়ছে। কোথাও ইট খুলে নেওয়া হয়েছে। কোথাও দেয়ালের গায়ে সময়ের ক্ষত। সমাধির ভেতর দিয়ে অবাধে ঢুকে পড়ছে চতুষ্পদ প্রাণী। শিয়ালের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে এককালের মানুষের শেষ ঠিকানা।

যাঁরা একদিন এই জনপদে এসেছিলেন, তাঁদের হাতে ছিল ক্ষমতা, ব্যবসা আর ঔপনিবেশিক শাসনের শক্তি। অথচ আজ তাঁদের নামটুকুও জানে না চৌগাছার মানুষ। তাঁরা কোথা থেকে এসেছিলেন, কার সন্তান ছিলেন, তাঁদের বাবা-মায়ের নাম কী, কোথায় জন্মেছিলেন, তাঁদের স্ত্রী বা স্বামী কে ছিলেন, তাঁদের কোনো সন্তান ছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর যেন কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
সম্ভবত তাঁদের কোনো উত্তরপুরুষ এ দেশে নেই। অথবা থাকলেও তাঁদের সঙ্গে এই মাটির সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে বহু আগেই। ফলে তাঁদের সমাধির ওপর ফুল দেওয়ার কেউ নেই, স্মরণ করার কেউ নেই। ইতিহাসের যে মানুষগুলো একসময় এই জনপদের অর্থনীতি ও কৃষিজীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁদের শেষ আশ্রয়টুকুও আজ অনাদরে পড়ে আছে।

চৌগাছায় একসময় দুটি নীল কারখানা ছিল। ১৯১২ সালে প্রকাশিত বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার যশোর-এ চৌগাছার নীল কারখানা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। গেজেটিয়ারে বলা হয়েছে, এখানে একটি বড় নীল কারখানা ছিল। সেটি নির্মাণ করেছিলেন মি. বাকসওয়ার্থ। একই সঙ্গে চৌগাছায় একটি ছোট নীল কারখানার কথাও বলা হয়েছে, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এদেশীয় ধনী ব্যবসায়ী নীলকান্ত পাড়ে।
অর্থাৎ চৌগাছার নীলশিল্পের ইতিহাস শুধু ইংরেজ নীলকরদের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারও একটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে।

বাকসওয়ার্থের বড় নীল কারখানাটি ঠিক কত সালে স্থাপিত হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট সাল গেজেটিয়ারে পাওয়া যায় না। তবে ১৯১২ সালের গেজেটিয়ার বলছে, কারখানাটি তখনকার সময় থেকে ৩০ বছরেরও বেশি আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ আনুমানিক ১৮৮০ সালের আগেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
আর কুঠিপাড়ার যে সমাধিতে আজ কেউ নাম জানে না, স্থানীয় মানুষের ধারণা- সেখানে শুয়ে আছেন সেই ইংরেজ নীলকরের কারখানায় কর্মরত দুই ইংরেজ। তাঁদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু তাঁরা ঠিক কোন সালে মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের নাম কী ছিল- তার নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

একসময় এই অঞ্চলে নীলচাষ ছিল লাভজনক ব্যবসা। কৃষকের জমিতে নীল চাষ হতো। নীল গাছ থেকে রং তৈরি করে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হতো। ইংরেজ নীলকরদের পাশাপাশি কিছু দেশীয় ব্যবসায়ীও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন। চৌগাছার নীলকুঠিগুলোও সেই বৃহত্তর নীল অর্থনীতির অংশ।
আর সেই ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে নীলকান্ত পাড়ের এক আশ্চর্য কাহিনি।

১৯১২ সালের যশোর গেজেটিয়ারে তাঁকে বলা হয়েছে ধনী ব্যবসায়ী। তিনি চৌগাছায় একটি ছোট নীল কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর উৎপাদিত নীল কলকাতায় বিক্রি হতো।
একদিন কলকাতায় নীল বিক্রি করে নীলকান্ত পাড়ে ১৪ হাজার টাকা নিয়ে চৌগাছায় ফিরছিলেন। পথে ডাকাতরা তাঁকে আক্রমণ করে। লুট করে নিয়ে যায় তাঁর কাছে থাকা পুরো টাকা।
১৪ হাজার টাকা!

আজকের অর্থমূল্যে-এর হিসাব করলে অঙ্কটি কত দাঁড়াবে, তা নিয়ে নানা হিসাব হতে পারে। কিন্তু উনিশ শতকের সেই সময়ে ১৪ হাজার টাকা ছিল বিপুল অর্থ। সেই অর্থ হারানোর ধাক্কা নীলকান্ত পাড়ে আর সামলে উঠতে পারেননি।
গেজেটিয়ারের ভাষায়, তিনি তাঁর ক্ষতি আর কখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে তাঁর নীল কারখানাটি বিক্রি করে দিতে হয় তারিণী চরণ ঘোষের কাছে।
তারিণী চরণ ঘোষও ছিলেন চৌগাছারই মানুষ। গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন একজন জমিদার। একসময় কৃষ্ণনগরে সরকারি উকিল হিসেবেও কাজ করেছিলেন। চৌগাছা বাজারের উত্তরে ছিল তাঁর বাড়ি।
নীলকান্ত পাড়ের কারখানা, বাকসওয়ার্থের নীলকুঠি আর কুঠিপাড়ার এই সমাধিগুলো- সব মিলিয়ে চৌগাছার মাটির নিচে যেন চাপা পড়ে আছে নীল যুগের এক বিস্মৃত ইতিহাস।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো- যাঁরা জীবিত অবস্থায় অন্যের জীবন ও জমির ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তাঁদের নিজেদের জীবনকথাই আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
একদিন হয়ত এই সমাধিগুলোও আর থাকবে না।

সময়ের ক্ষয়, মানুষের অবহেলা আর দখলের চাপ- সব মিলিয়ে একদিন হয়ত কুঠিপাড়ার এই শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। সেখানে হয়ত উঠবে সুরম্য অট্টালিকা, তৈরি হবে নতুন বসতি। কেউ জানবেও না, এই মাটির নিচে একসময় দুই অচেনা ইংরেজ শুয়ে ছিলেন।

তাঁরা কারা ছিলেন, জানা নেই। তাঁদের নাম কী, জানা নেই। কোথায় জন্মেছিলেন, জানা নেই। কার সন্তান ছিলেন, জানা নেই। তাঁদের পরিবার কোথায়, জানা নেই।
শুধু জানা যায়- তাঁরা এসেছিলেন এই বাংলায়। নীলের সেই ঔপনিবেশিক সময়ের সঙ্গে তাঁদের জীবন জড়িয়েছিল। তারপর কোনো একদিন ম্যালেরিয়ার কাছে হার মেনে এই কপোতাক্ষ পাড়ের মাটিতেই তাঁরা চিরঘুমে শুয়ে পড়েছিলেন। 
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: