আজ বাঙালির সকাল যেন এক পেয়ালা চা ছাড়া অসম্পূর্ণ। ঘুম ভাঙার পর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, অফিসের টেবিলে চা, বিকেলের আড্ডায় চা, অতিথি এলে চা, মন খারাপেও চা- এ যেন বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এই চা একদিন বাংলার ঘরের আপন পানীয় ছিল না। কয়েক শতাব্দী আগে বাংলার মানুষ চায়ের নামও জানত না, চায়ের এই দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে চীন, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, কলকাতা, আসাম, দার্জিলিং, ঔপনিবেশিক বাণিজ্য, বিজ্ঞাপন- এমনকি বাঙালির আড্ডা সংস্কৃতির ইতিহাসও।
চায়ের জন্মভূমি চীন। বহু শতাব্দী ধরে চীনেই চা উৎপাদন ও পান জনপ্রিয় ছিল। ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে সপ্তদশ শতাব্দীতে চা ইউরোপে পৌঁছায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ইংল্যান্ডে তা অভিজাতদের পানীয় থেকে সাধারণ মানুষের পানীয়তে পরিণত হতে শুরু করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনের সঙ্গে চায়ের ব্যবসায় বিপুল অর্থ উপার্জন করছিল। কিন্তু চীনের ওপর নির্ভরশীলতা ব্রিটিশদের কাছে ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তাই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে চা উৎপাদনের চিন্তা শুরু হয়।
বাংলার সঙ্গে চায়ের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। ১৭৭৪ সালের দিকে বাংলার গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস চীন থেকে চা-এর চারা সংগ্রহ করে ভুটানে ব্রিটিশ দূত জর্জ বোগলের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। ১৭৮০ সালে কর্নেল রবার্ট কিড কলকাতার শিবপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত উদ্ভিদ উদ্যানে চীনা চায়ের গাছ লাগানোর পরীক্ষা করেন। অর্থাৎ বাণিজ্যিক চা-বাগান তখনও দূরের কথা, কলকাতার মাটিতেই চায়ের গাছ পরীক্ষামূলকভাবে বেড়ে উঠছিল।
আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো- ১৭৮১ সালের Hicky's Bengal Gazette-এর একটি বিজ্ঞাপনে কলকাতায় ‘Hyson Tea’ ও ‘Souchong Tea’ বিক্রির কথা পাওয়া যায়। অর্থাৎ আঠারো শতকের শেষভাগেই কলকাতায় চা একটি আমদানিকৃত বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল। বিজ্ঞাপনটিতে চা অন্য পণ্যের সঙ্গে বিক্রির কথা বলা হয়েছে এবং খুচরা ক্রেতাদের জন্যও চা মাপ অনুযায়ী বিক্রির উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার- কলকাতায় চা বিক্রি হওয়া আর বাঙালির মধ্যে চা-পানের অভ্যাস তৈরি হওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমদিকে চা ছিল মূলত ইউরোপীয় ও শহুরে উচ্চবিত্ত সমাজের পানীয়। কলকাতার সাহেবি ট্যাভার্ন, হোটেল ও কফিহাউসে চা-কফির আসর বসত। ১৭৮০ সালের কলকাতার একটি ট্যাভার্নের বিবরণে চা-কফির মজলিসের উল্লেখও পাওয়া যায়।
এরপর চায়ের ইতিহাসে আসে এক বিরাট মোড়। ব্রিটিশরা জানতে পারে, আসামের জঙ্গলে এমন এক উদ্ভিদ জন্মায় যার পাতা থেকে চা তৈরি করা যায়। ১৮২৩ সালে রবার্ট ব্রুস আসামের ওপরের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সিংফো জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত চা-গাছের সন্ধান পান। স্থানীয় সিংফো ও খামতি জনগোষ্ঠী এই গাছের পাতা পানীয় হিসেবে ব্যবহার করত বহু আগে থেকেই। ফলে বলা যায়, ভারতে চা ব্রিটিশরা আবিষ্কার করেনি; তারা স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত চা-গাছকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের আওতায় নিয়ে এসেছিল।
১৮২৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধের পর ইয়ান্ডাবু চুক্তির মাধ্যমে আসাম ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর চা নিয়ে ব্রিটিশদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত এগোয়। ১৮৩৪ সালে কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনের উদ্ভিদবিদ ন্যাথানিয়েল ওয়ালিচ আসামের চা-গাছকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে চা-চাষের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য Tea Committee গঠিত হয়।
চার্লস আলেকজান্ডার ব্রুসের নেতৃত্বে আসামে চা উৎপাদনের পরীক্ষাও সফল হতে থাকে। ১৮৩৮ সালে আসামের চায়ের প্রথম চালান ইংল্যান্ডে যায়। ১৮৩৯ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডনের বাজারে আটটি বাক্স- মোট প্রায় ৩৫০ পাউন্ড- আসামের চা নিলামে বিক্রি হয়। এটিই ভারতীয় চায়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি ঐতিহাসিক সূচনা। একই বছর গড়ে ওঠে Assam Company।
এই ইতিহাসে কলকাতার বাঙালি ব্যবসায়ীদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৮৩৯ সালে গঠিত Assam Company-র সঙ্গে কলকাতার বণিকসমাজ যুক্ত হয়েছিল। বাংলার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঠাকুরও এই চা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি Assam Company-র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের একজন ছিলেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে চায়ের সম্পর্ক শুধু চা-পানের সৌখিনতার নয়, উনিশ শতকের চা-বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
আসামে যখন চায়ের বাগান গড়ে উঠছে, তখন বাংলার অন্য প্রান্তেও চা-চাষের সম্ভাবনা দেখা দেয়। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে চীনা জাতের চা-গাছের চাষ শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। একই সময়ে সিলেট ও চট্টগ্রামেও চা-চাষ বিস্তার লাভ করে। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে চা-চাষের ইতিহাসও এই ঔপনিবেশিক উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে চা-চাষের পরীক্ষা শুরু হয় এবং ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম চা-বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু চা-বাগান তৈরি হলেই তো বাঙালি চা-খোর হয়ে গেল না। চা তখনও মূলত সাহেবদের পানীয়। ভারতীয় সাধারণ মানুষকে চা খাওয়ানোর জন্য পরে শুরু হয় পরিকল্পিত প্রচার। চা-শিল্পের সামনে তখন একটি বড় সমস্যা- ভারতে চা উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু ভারতীয়রা নিজেরাই পর্যাপ্ত চা পান করছে না। ফলে চা-কে ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে শুরু হয় প্রচার ও বিজ্ঞাপন।
বিশ শতকের গোড়াতেও চা নিয়ে ভারতীয় সমাজে নানা আপত্তি ছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কিছু নেতা চা-পানের বিরোধিতা করেছিলেন। চায়ের বাগানে শ্রমিকদের শোষণ ও ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সঙ্গে চায়ের সম্পর্কও সমালোচিত হয়েছিল। এমনকি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় চা নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করেছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধীও চায়ের ক্ষতিকর দিক নিয়ে লিখেছিলেন।
তবু চা থেমে থাকেনি। বরং চা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলো প্রচার বাড়াতে থাকে। ১৯৩৩ সালে Tea Cess Committee-কে পুনর্গঠন করে Tea Marketing Expansion Board করা হয়। রেলস্টেশনসহ নানা জায়গায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হতে থাকে- কীভাবে চা বানাতে হবে, কেন চা পান করা উচিত, এমন নানা বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রচারের ফলে ১৯৩০-এর দশকে ভারতের চা-খাওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
এরপর চা ধীরে ধীরে সাহেবের কাপ থেকে সাধারণ মানুষের হাতে চলে আসে। রেললাইন, শহর, বাজার, অফিস, কারখানা- সব জায়গায় চায়ের বিস্তার ঘটতে থাকে। আর বাঙালির জীবনে চা শুধু পানীয় থাকল না, হয়ে উঠল আড্ডার অজুহাত।
বিংশ শতকের গোড়ায় কলকাতায় Favorite Cabin- এর মতো চায়ের দোকানও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, টোস্ট, কাটলেট- এসবও যুক্ত হতে থাকে। ফলে চা হয়ে ওঠে শুধু পানীয় নয়, এক ধরনের নগরজীবনের সংস্কৃতি। পরবর্তী সময়ে বাঙালির আড্ডায় চা আর সিগারেট যেন প্রায় অবিচ্ছেদ্য জুটি হয়ে দাঁড়ায়। কলকাতা থেকে ঢাকায়, মফস্বল শহর থেকে গ্রাম- চায়ের দোকান হয়ে ওঠে খবরের কাগজ পড়া, গল্প করা, রাজনীতি আলোচনা এবং সময় কাটানোর জায়গা।
চায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বাঙালির আতিথেয়তাও। বাড়িতে অতিথি এলে প্রশ্ন- ‘চা খাবেন?’ অফিসে নতুন কেউ এলে- ‘এক কাপ চা দেব?’ সাংবাদিকদের টেবিলে চা, শিক্ষকদের আড্ডায় চা, সাহিত্যিকদের বৈঠকে চা, রাজনৈতিক কর্মীদের আলোচনায় চা- চা যেন কথোপকথনের সামাজিক সেতু।
একসময় যে পানীয় ছিল বিদেশি সাহেবদের বিলাসিতা, সেটিই পরে হয়ে গেল বাঙালির সবচেয়ে আপন পানীয়গুলোর একটি। চীনের পাহাড় থেকে ব্রিটিশ জাহাজে, কলকাতার বাজার থেকে আসামের বাগানে, সাহেবের টেবিল থেকে বাঙালির মাটির ভাঁড়ে- চায়ের এই দীর্ঘ যাত্রা আসলে বাংলার ঔপনিবেশিক আধুনিকতারও একটি ছোট ইতিহাস।


























