সোমবার ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৈয়দপুর জমিদারি

যশোর-খুলনার ইতিহাসে দানবীর মহসীনের উত্তরাধিকার

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৬:৩১, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যশোর-খুলনার ইতিহাসে দানবীর মহসীনের উত্তরাধিকার

যশোর-খুলনার ইতিহাসের পাতা উলটালে একসময় চোখে পড়ে এক বিস্মৃত জমিদারির নাম- সৈয়দপুর জমিদারি। আজকের মানচিত্রে তার বিস্তৃতি ও পরিচয় আগের মতো সহজে ধরা যায় না। কিন্তু একসময় যশোরের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের জমিদারি কাঠামোর সঙ্গে এই এস্টেটের গভীর সম্পর্ক ছিল। আরও বিস্ময়কর হলো, এই জমিদারি শেষ পর্যন্ত কোনো বংশের উত্তরাধিকারী জমিদারের হাতে থেকে যায়নি, তা পরিণত হয়েছিল একটি ট্রাস্ট এস্টেটে, যার আয় ব্যয় হয়েছে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণে।

যশোর জেলা প্রশাসনের ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, পুরোনো উলটালে জমিদারি ছিল মূল জমিদারির বারো আনা। বাকি চার আনা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে একজন মুসলিম ভূস্বামীর হাতে যায় এবং পরবর্তীকালে সেই অংশই সৈয়দপুর জমিদারি নামে পরিচিত হয়।

কিন্তু এই চার আনা জমিদারির পেছনের কাহিনি আরও পুরোনো। উনিশ শতকের গোড়ার দিকের ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, মূল যশোর বা ইউসুফপুর জমিদারি থেকে সনদের মাধ্যমে একটি অংশ মুসলিম ভূস্বামী মির্জা সালাহউদ্দীন মহম্মদ খানের হাতে আসে। সরকারি পুরোনো প্রতিবেদনের উদ্ধৃতিতেও তাঁর নাম ঝবষষধযঁফ-ফরবহ গধযড়সবফ কযধহ হিসেবে পাওয়া যায়। সৈয়দপুরের অধীনে যশোরের একটি অংশ এবং প্রাচীন ইউসুফপুরের ভূ-অধিকারেরও প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই বন্দোবস্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মির্জা সালাহউদ্দীন ছিলেন হুগলির অভিজাত মুসলিম পরিবারের মানুষ। তিনি ছিলেন আগা মোতাহেরের আত্মীয় এবং হাজি মুহম্মদ মহসীনের বৈমাত্রেয় বোন মুন্নজান খানমের স্বামী। ব্রিটিশ লেখক জে. টি. ব্র্যাডলি-বার্টের ঞবিষাব গবহ ড়ভ ইবহমধষ রহ ঃযব ঘরহবঃববহঃয ঈবহঃঁৎু গ্রন্থে সালাহউদ্দীনের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে তিনি শুধু একজন ভূস্বামী ছিলেন না; স্ত্রীর বিশাল সম্পত্তি পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং সম্পত্তির উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট মানুষের কল্যাণে মনোযোগী ছিলেন।

তাঁদের দাম্পত্য জীবন অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মির্জা সালাহউদ্দীন অকালেই মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর মুন্নজান খানম আর বিয়ে করেননি। স্বামীর স্মৃতিকে ধরে রেখে তিনি নিজের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যান। হুগলিতে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ইমামবাড়া ও বাজারও সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে।

এই জায়গাতেই সৈয়দপুর জমিদারির ইতিহাস এসে মিশে যায় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানবীর হাজি মুহম্মদ মহসীনের জীবনের সঙ্গে।
মহসীন ছিলেন মুন্নজান খানমের বৈমাত্রেয় ভাই। দীর্ঘদিন দেশ-বিদেশ ভ্রমণ ও জ্ঞানার্জনের পর তিনি হুগলিতে ফিরে আসেন। তখন তাঁর বোন মুন্নজান খানম বিপুল সম্পত্তির অধিকারী। ঐতিহাসিক বিবরণে জানা যায়, ১৮০৩ সালে মুন্নজান খানম তাঁর সম্পত্তি ভাই মহসীনের নামে লিখে দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে সৈয়দপুর জমিদারিসহ বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন হাজি মুহম্মদ মহসীন।
কিন্তু এখানেই মহসীনের কাহিনি অন্য সব জমিদারের ইতিহাস থেকে আলাদা হয়ে যায়।

তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত ভোগের সম্পদ হিসেবে দেখেননি। তাঁর নিজের কোনো সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিল না। তাই বিপুল সম্পত্তি কীভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়, সেই চিন্তাই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর সম্পত্তি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর দানপত্রে যশোরের অধীন সৈয়দপুর ও শোভনাল জমিদারিকে নিজের জমিদারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই সম্পত্তি ‘সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট’ নামে পরিচিত হয়।
অর্থাৎ সৈয়দপুর জমিদারি হয়ে উঠল একটি ন্যাস-সম্পত্তি বা ট্রাস্ট এস্টেট।

মহসীনের মৃত্যুর পর সম্পত্তি পরিচালনা নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দিলে সরকারকে এর ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করতে হয়। যশোরের কালেক্টরের ওপর সম্পত্তির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পড়ে। পুরোনো সদর কাছারি ছিল যশোরের মুড়লীতে। পরে কাছারি বাড়িতে আগুন লাগায় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নষ্ট হয় এবং ১৮১৭ থেকে ১৮১৯ সালের মধ্যে নতুন করে জরিপ ও জমাবন্দির কাজ করা হয়।
এরপর ধীরে ধীরে জমিদারির অধিকাংশ অংশ পত্তনি বন্দোবস্তে দেওয়া হয়। এর ফলে এস্টেটের আয় বাড়ে এবং পত্তনি ও সেলামি বাবদ বিপুল অর্থও আদায় হয়। পরবর্তী সময়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই অর্থের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও জনকল্যাণে ব্যবহারের পথ তৈরি হয়।

সৈয়দপুর জমিদারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় খুলনার সঙ্গে যুক্ত। ১৮৮২ সালে খুলনা পৃথক জেলা হলে সৈয়দপুর স্টেটের সদর অফিস খুলনায় স্থানান্তরিত হয় এবং খুলনার কালেক্টর-এর এজেন্ট হন। ফলে একসময় যশোরের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই জমিদারি প্রশাসনিকভাবেও খুলনার ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
এই কারণেই সৈয়দপুর জমিদারি যশোর-খুলনার ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে এর জন্ম হয়েছিল পুরোনো যশোর জমিদারির বিভাজন থেকে, অন্যদিকে এর উত্তরাধিকার এসে মিশেছিল হুগলির হাজি মুহম্মদ মহসীনের দানশীলতার সঙ্গে। ফলে জমিদারির ইতিহাস অতিক্রম করে এটি হয়ে ওঠে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের ইতিহাস।

মহসীনের সম্পত্তি থেকে গড়ে ওঠা মহসীন ফান্ড বাংলার মুসলমান সমাজে শিক্ষার বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, এই তহবিল থেকে মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজের মুসলিম শিক্ষার্থী এবং বৃত্তি প্রার্থীদের সহায়তা দেওয়া হতো।

এই দানের সুফল পেয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিক্ষার্থী। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে মহসীন বৃত্তির অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক বিবরণে সৈয়দ আমীর আলী, স্যার আবদুর রহিম, স্যার সৈয়দ শামসুল হুদাসহ বহু বিশিষ্ট শিক্ষিত ব্যক্তির। 

মনে রাখতে হয় সেই মানুষটির কথাও, যিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিপুল সম্পদ নিজের জন্য রেখে না দিয়ে মানুষের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন- হাজি মুহম্মদ মহসীন। তার সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে মানুষের শিক্ষার ভেতর- যে শিক্ষা একদিন বাংলার অগণিত দরিদ্র মুসলমান তরুণকে নতুন জীবনের দরজা খুলে দিয়েছিল।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: