সোমবার ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমার দেখা নেপাল

মাহমুদুল হাসান

প্রকাশিত: ১২:১৩, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমার দেখা নেপাল

ভ্রমণ মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভ্রমণ ভালোবাসেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। মন খারাপ বা বিষণ্ণতা কাটানো কিংবা মনের শক্তি জোগাতে মানুষ ঘুরতে বের হয়। আমি-ও তার ব্যতিক্রম নই। ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণের প্রতি আমার দারুণ আকর্ষণ। তখন খুব বেশি দূরে যাওয়ার সুযোগ না হলেও, আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করাটা ছিল আমার এক ধরনের নেশা।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছি। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও যাওয়া হয়েছে কয়েকবার। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং পাশাপাশি একটি ছোটখাটো চাকরিতে যোগ দিই। ঠিক তখন থেকেই মনের কোণে একটি স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে—নিজের চেপে কোনো দেশে বিদেশ ভ্রমণে যাব। ইউটিউবে কম খরচে সুন্দর ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে আসার জায়গা খুঁজতে গিয়ে চোখ আটকায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালে। স্বল্প জনসংখ্যা আর পাহাড়ি দেশটির রূপ আমায় মুগ্ধ করে। শুরু হলো আমার বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতি। বিমানের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে ভিসার কাজ—সবকিছুতেই অভিজ্ঞ মানুষদের সহযোগিতা নিলাম। পরিচিত আশরাফুল ভাইয়ের মাধ্যমে অফার প্রাইসে একটি টিকিট কাটলাম। চুক্তি হলো, অর্ধেক টাকা এখন দেব আর বাকিটা প্রতি মাসের বেতন থেকে শোধ করব। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। প্রায় দেড় মাস আগেই হিমালয় এয়ারলাইন্সের একটি টিকিট পেয়ে গেলাম ৩৯ হাজার টাকায়।

যেহেতু জীবনে প্রথমবার বিমানে উঠছি এবং তা-ও আবার আন্তর্জাতিক সফর, তাই মনের ভেতর তীব্র উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। পরিচিত কেউ নেই, অভিজ্ঞতাও নেই বললেই চলে। পাসপোর্ট ও ডলার ক্যাশ করা মিলিয়ে মোট খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় এক লাখ টাকার মতো। এই অর্থ জোগাড় করা আমার জন্য কিছুটা কষ্টকর হলেও ভ্রমণের আনন্দ যেন সব চাপ ভুলিয়ে দিল।

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ—১২ জুন ২০২৪। বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকায় এক বন্ধুর বাসায় উঠলাম, কারণ ১৩ জুন কাঠমাণ্ডুর উদ্দেশ্যে আমার ফ্লাইট। ফ্লাইটের তিন ঘণ্টা আগেই বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। তবে মনে একটা চাপা ভয় ছিল—ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া কেমন হয় তা নিয়ে!

যে ভয়ের আশঙ্কা করছিলাম, ঠিক সেটাই হলো। ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ানোর পর আমাকে এক বিশেষ কাউন্টারে পাঠানো হলো এবং সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি নির্দিষ্ট রুমে। পরিস্থিতি দেখে আমার ভয় আরও বেড়ে গেল। ইমিগ্রেশনের ওসি সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "কী করেন?" আমি বললাম, "পড়াশোনা করি।" "নেপাল কেন যাচ্ছেন?" "ভ্রমণের জন্য।" "সাথে কেউ আছে?" "না, আমি একা।" তিনি আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বললেন। এতে আমার মনের অবস্থা তখন বেশ নাজুক। পাশে কয়েকজন মন্তব্য করছিল যে আমাকে যেতে দেওয়া হবে না। কিছুক্ষণ পর এক কর্মকর্তা এসে আমার নাম ধরে ডেকে বললেন, "আপনি যেতে পারবেন না।" আমি ভীষণত্রস্ত হয়ে কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, "আপনার পাসপোর্টে ডলার এনডোর্সমেন্ট করা নেই কেন?" তা ছাড়া একা যাওয়াও তারা সন্দেহ করছিলেন, আমি হয়তো আর দেশে ফিরে আসব না! একপ্রকার কান্নাকাটি করার মতো অবস্থা নিয়ে বললাম, "স্যার, আমি কেবল ঘুরতেই যাচ্ছি। এত নিয়মকানুন জানতাম না। ইউটিউব দেখে নিজে নিজেই সব করেছি, কোনো এজেন্সির সাহায্য নিইনি।" কর্মকর্তা বললেন, "ডলার এনডোর্সমেন্ট ছাড়া বিদেশে গিয়ে খরচ করবেন কীভাবে?" আমি জানালাম, আমার কাছে ক্যাশ ৩০০ ইউএস ডলার আছে। তিনি তা দেখতে চাইলে দেখালাম। তিনি আবার ওসি সাহেবের রুমে গিয়ে আলোচনা করলেন। এদিকে ফ্লাইটের সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। চরম উদ্বেগের মাঝে আমি আবার অফিসারকে অনুরোধ জানালাম। অবশেষে ফ্লাইটের ঠিক কিছুক্ষণ আগে তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, "ভবিষ্যতে এই ভুল করবেন না, অবশ্যই পাসপোর্টে ডলার এনডোর্সমেন্ট করে নেবেন।" স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম! মনে হলো ভ্রমণের আসল আনন্দের চেয়েও বড় আনন্দ পেয়ে গেছি এই বাধা পার হয়ে। অফিসারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে দৌড়ালাম বিমানের দিকে।

বিমানের ভেতরে একা বসে আছি। পাশে আসন গ্রহণ করেছেন একজন সুশ্রীভ্যাস নারী। আমার ইচ্ছে ছিল জানালায় পাশের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করার, কিন্তু নিজের আসল থেকে তা সুবিধাজনক ছিল না। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে সেই প্রবাসী রমণী ইংরেজিতে জানতে চাইলেন তিনি আমাকে সাহায্য করতে পারেন কি না। আমি সানন্দে রাজি হলাম এবং তিনি বেশ কয়েকটি সুন্দর ছবি ও ভিডিও তুলে দিলেন। বিমানের পেছনের আসনে পরিচিত হলাম বাপ্পি ও সূর্য নামের দুজন বাঙালি ভাইয়ের সাথে। তারাও প্রথমবার নেপাল যাচ্ছেন। আমরা তিনজন এক হয়ে যাওয়ায় মনের জোর অনেকটাই বেড়ে গেল। প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা উড়াল দেওয়ার পর আমরা নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। পাহাড়ি বিমানবন্দর সম্পর্কে দুর্ভাবনা কিছু গুণ শুনে কিছুটা ভয় কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত নিরাপদে নামতে পেরে স্বস্তি পেলাম।

বিমানবন্দর থেকে কিছু ডলার ভাঙিয়ে নেপালি রুপি করে নিলাম। এরপর ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম কাঠমাণ্ডু থামেল এলাকায়। প্রথম রাতের জন্য একটি হোটেল রুম ভাড়া করলাম। পরদিন ভোরে আমাদের পোখারার বাস ধরতে হবে। সকালে পোখারার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পাহাড়ি দুর্গম পথ পেরিয়ে রাত প্রায় ১০টায় পোখারা পৌঁছালাম। সেখানে আরও এক বাঙালি ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো এবং আমাদের দল বল্লভ চারজনের। আমরা চারজন মিলে হোটেলে উঠলাম।

একদিন পর আমরা আরও দূরে ফোখাও যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। বাপ্পি ভাই ভ্রমণ পরিকল্পনায় বেশ অভিজ্ঞ। তিনি ঠিক করলেন আমরা ‘মুস্তাং’ যাব—যা নেপালের শেষ প্রান্তের এক পাহাড়ি এলাকা এবং এভারেস্টের কাছাকাছি। রাতে ভেজি সামাই এর নেপালি জিপ ড্রাইভারের সাথে চুক্তি হলো। মুস্তাংয়ের পথ অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় রাতের বেলা গাড়ি চালানো সম্ভব নয়, তাই পরদিন ভোরে যাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত হলো। ভোরেবেলা ড্রাইভার যথা সময়ে এসে আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করল। আঁকাবাঁকা পথ, বিশাল সব পাহাড় আর শীতল বাতাসের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পথের প্রতিটি বাঁকে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি পরিবেশ ও মানুষের সরল জীবনযাত্রা উপভোগ করছিলাম। যাত্রাপথে আমরা তিব্বতীয় সংস্কৃতির ‘মারফা’ গ্রামে থামলাম। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুপরিচিত এই গ্রামে প্রচুর আপেল বাগান রয়েছে। গাছ থেকে সদ্য তোলা তাজা আপেল খাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই চমৎকার ছিল। ঘণ্টাখানেক পর আবার মুস্তাংয়ের পথে রওনা হলাম। এবার যেন এক মরুভূমির পথ শুরু হলো—চারপাশে কোনো সবুজ গাছপালা নেই, কেবল বালি আর পাথর। প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে অবশেষে মুস্তাং পৌঁছালাম। সেখানকার তাপমাত্রা ছিল ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস—বেশ কনকনে ঠান্ডা! রাতে হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন ভোরে হেঁটে ‘মুক্তিনাথ’ মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মুক্তিনাথ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এক পবিত্র তীর্থস্থান। হোটেল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার খাঁড়া পাহাড়ি পথ হেঁটে ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। অনেকে ঘোড়ায় উঠলেও আমরা ধীরেসুস্থে হেঁটে হেঁটে মুক্তিনাথে পৌঁছে গেলাম।

ঐতিহ্যবাহী মন্দির ও চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করার পর আমাদের ইচ্ছে হলো এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের শুরুর পয়েন্টের দিকে যাওয়ার, যার দূরত্ব ছিল ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার। কিন্তু প্রায় ১ কিলোমিটার ওঠার পর শরীরের ক্লান্তি ও অক্সিজেনের অভাবে আমার আর সূর্য ভাই ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাপ্পি ভাই ও হাবিব ভাই সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তারা ফিরে এলে আমরা আবার হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

আমরা মুস্তাঙে একদিন অবস্থান করে সেখানকার স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবার উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। নেপালের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘নেপালি থালি’ ট্রাই করলাম, তবে সত্যি বলতে বাঙালি খাবারের স্বাদের সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। দুপুরের খাবারের সময় রাতে এক পার্টিতে যোগ দেওয়ার নিমন্ত্রণ পেলাম, যেখানে অন্যান্য দেশের পর্যটকরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বাংলাদেশ, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ১২-১৫ জন পর্যটকের সাথে দারুণ এক আড্ডা জমল। ভিন্ন ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, গান ও নাচের মধ্য দিয়ে চমৎকার একটি রাত কাটল। মুস্তাঙে তিন দিন কাটানোর পর ফেরার পথে আমরা গেলাম অপরূপ সুন্দর ‘ফুবা লেকে’। লেকের স্বচ্ছ পানির ধারে এক ঘণ্টার মতো আনন্দময় সময় কাটিয়ে আবার পোখারার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

পোখারা পৌঁছানোর দিনই ছিল পবিত্র ঈদুল আজহা। পরবাসে ঈদের নামাজ বাড়িয়ে বিকেলে ফোখারা লেকের পাড়ে শান্ত মুহূর্ত কাটালাম। পোখারার আবহাওয়াকে আমরা ব্যাকপ্যাকিং ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিই। সারংকোটে যেতে কেবল কারে চড়তে হয়—যা ছিল আমার জন্য জীবনের অন্যতম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা! শূন্যে ভাসমান তারে ঝুলন্ত থাকা বাক্সের ভেতর বসে পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়ার মুহূর্তটি ছিল অতুলনীয়।

বিকেলের সময়টুকু সারংকোটে কাটিয়ে সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে কেনাকাটা শেষ করলাম এবং বিমান বন্দরের দিকে রওনা হলাম। বিমান বন্দরের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অবশেষে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে উড়াল দিলাম। পাহাড়ের বুক চিরে ভেসে থাকা সবুজ দৃশ্য, দূরে এভারেস্টের হিমেল হাওয়া আর নেপালিদের উষ্ণ আতিথেয়তা আমার স্মৃতির পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। এই নেপাল ভ্রমণ সত্যি আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: