শুক্রবার ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গিরিশচন্দ্র নাগের চোখে যশোর 

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:১০, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গিরিশচন্দ্র নাগের চোখে যশোর 

আজকের যশোর শহরকে দেখে প্রায় দেড়শ বছর আগের শহরটিকে কল্পনা করা কঠিন। তখন শহরের পরিধি ছিল ছোট, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল ধীর, ভৈরব নদ ছিল যাতায়াতের অন্যতম পথ, আর প্রশাসনের কেন্দ্র ঘিরেই গড়ে উঠেছিল শহরের সামাজিক জীবন। আদালত, কাছারি, কালেক্টরেট, মোক্তার, আমলা, জমিদার, ব্যবসায়ী- সব মিলিয়ে ঔপনিবেশিক যশোর ছিল এক অদ্ভুত মিশ্র সমাজ।

সেই হারিয়ে যাওয়া যশোরকে চিনতে হলে সমকালীন সরকারি নথির পাশাপাশি প্রয়োজন তাঁদের লেখা, যাঁরা নিজের চোখে সেই শহর দেখেছিলেন। এই দিক থেকে গিরিশচন্দ্র নাগের ‘ডেপুটির জীবন’ বিশেষ মূল্যবান। তিনি ব্রিটিশ আমলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বাংলার বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় কাজ করেছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথায় প্রশাসনিক জীবনের পাশাপাশি তৎকালীন সমাজের নানা অন্দরকথা উঠে এসেছে। গবেষণামূলক লেখাতেও তাঁকে বাংলা প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় কর্মরত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গিরিশচন্দ্রের যশোর-পর্বের বিশেষত্ব হলো, তিনি শহরটিকে কোনো দূরবর্তী পর্যবেক্ষকের চোখে দেখেননি। তিনি ছিলেন সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থারই একজন অংশ। ফলে তাঁর স্মৃতিতে যশোরের আদালত, সাহেব কর্মকর্তা, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, আমলা, মোক্তার এবং শহুরে বাবুসমাজ একই ছবির বিভিন্ন চরিত্র হয়ে উঠেছে।

তাঁর লেখার সূত্র ধরে যে যশোরকে দেখা যায়, সেটি ছিল একদিকে কঠোর ঔপনিবেশিক প্রশাসনের শহর, অন্যদিকে অদ্ভুত সামাজিক বৈপরীত্যে ভরা একটি জনপদ।
ইংরেজ শাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন ছিল প্রশাসন। কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন জেলার সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাঁর অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি কালেক্টর, পুলিশ কর্মকর্তা, নাজির, পেশকার, কেরানি- বিরাট এক প্রশাসনিক কাঠামো কাজ করত। কিন্তু এই কাঠামোর ভেতরেও ব্যক্তিমানুষের চরিত্রের বড় ভূমিকা ছিল।
গিরিশচন্দ্রের স্মৃতিতে ইংরেজ কর্মকর্তাদের কেউ ছিলেন দক্ষ, কেউ সৎ, কেউ আবার খামখেয়ালি। তিনি তাঁদের চরিত্র বিচার করেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর বর্ণনায় ইংরেজ কর্মকর্তা মানেই একরকম মানুষ নয়। কেউ স্থানীয় মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, কেউ আবার ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষকে তুচ্ছ করতেন।

এই জায়গাটিই গিরিশচন্দ্রের স্মৃতিকথাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সরকারি রিপোর্টে সাধারণত লেখা থাকে- কতটি মামলা নিষ্পত্তি হলো, কত টাকা রাজস্ব আদায় হলো, কোথায় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দিল। কিন্তু একজন কর্মকর্তা নিজের স্মৃতিতে লিখলে দেখা যায় সেই মানুষগুলোর স্বভাব, রসবোধ, দুর্বলতা, অহংকার এবং ব্যক্তিগত জীবন।

যশোরের সামাজিক জীবন নিয়েও তাঁর স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ। আদালত ও প্রশাসনকে ঘিরে যে বাবুসমাজ তৈরি হয়েছিল, তার জীবনযাপন ছিল আজকের চোখে বিস্ময়কর। শহরে জমিদার, মোক্তার, আমলা ও ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে সামাজিক প্রতিযোগিতা ছিল। অর্থ ও প্রতিপত্তির প্রদর্শনও ছিল সেই প্রতিযোগিতার একটি অংশ।
গিরিশচন্দ্র নাগের স্মৃতিতে এমন একটি যশোরের কথাও পাওয়া যায়, যেখানে রক্ষিতা রাখা এবং তার জন্য পাকা বাড়ি নির্মাণ করাকে সমাজের কোনো কোনো অংশে মর্যাদার বিষয় হিসেবেও দেখা হতো। পরবর্তী গবেষণামূলক লেখাগুলোও তাঁর ‘ডেপুটির জীবন’-এর সঙ্গে এই প্রসঙ্গের যোগসূত্র উল্লেখ করেছে।

এই তথ্যটির মধ্য দিয়ে উনিশ শতকের শহুরে মধ্যবিত্ত ও অভিজাত সমাজের নৈতিকতার দ্বৈত চরিত্রও ধরা পড়ে। একদিকে প্রকাশ্যে ধর্ম, নীতি ও সামাজিক মর্যাদার কথা; অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ।
যশোরের সেই শহুরে জীবনে কলকাতারও প্রভাব ছিল প্রবল। কলকাতার বাবুসমাজের সঙ্গে যশোরের জমিদার ও বিত্তশালীদের যোগাযোগ ছিল। নদীপথে কলকাতা থেকে মানুষ আসত। ভৈরব নদ ছিল তখন শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ। আজকের মতো সড়ক ও রেল যোগাযোগ তখনও যশোরের জীবনকে বদলে দেয়নি।

গিরিশচন্দ্রের স্মৃতিতে যশোরের রাতের সামাজিক জীবন ও শহরের নিষিদ্ধ বিনোদনকেন্দ্রের কথাও উঠে এসেছে। এই তথ্য পরবর্তী লেখকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়েছে। যশোরের গণিকালয় ও বাবুসমাজ নিয়ে প্রকাশিত গবেষণামূলক লেখায় গিরিশচন্দ্র নাগের ‘ডেপুটির জীবন’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে এই বিবরণকে কেবল কৌতূহলের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ইতিহাসের দিক থেকে এর গুরুত্ব অন্যত্র। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, উনিশ শতকের যশোরে একটি নতুন শহুরে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছিল। আদালত ও প্রশাসনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছিল নতুন পেশাজীবী শ্রেণি। জমিদারদের পাশাপাশি মোক্তার, আমলা, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মচারীরা শহরের সামাজিক নেতৃত্বে উঠে আসছিলেন। তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও অবসর বিনোদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছিল নতুন ধরনের নগরজীবন।

এই পরিবর্তনের পেছনে ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকা ছিল বড়। জেলা সদর হিসেবে যশোরে আদালত ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ফলে শহরের গুরুত্ব বাড়ে। সরকারি কর্মচারী, আইনজীবী, মোক্তার, ব্যবসায়ী ও নানা পেশার মানুষ এখানে এসে বসতি গড়তে থাকেন। ফলে পুরোনো জনপদের ওপর তৈরি হয় নতুন প্রশাসনিক শহর। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: