যশোরের কসবা এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো পুরাতন কালেক্টরেট ভবনটি সংরক্ষণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সম্প্রতি ভবনটি পরিদর্শন করে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক, স্থাপত্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ভবনটিকে ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করা হয়েছে।
যশোর শহরের কসবা এলাকায় অবস্থিত এই ভবনটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুর দিকের প্রশাসনিক স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ভবনটির সঙ্গে শুধু যশোর জেলার প্রশাসনিক ইতিহাস নয়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কর্মজীবনেরও সরাসরি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একসময় এই ভবনের একটি কক্ষেই বসে তিনি তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বাংলায় ব্রিটিশ প্রশাসনিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হওয়ার সময় যে-সব গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক স্থাপনা গড়ে উঠেছিল, যশোরের পুরাতন কালেক্টরেট ভবন তার অন্যতম। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি লাভের পর রাজস্ব আদায় ও বিচারব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন প্রশাসনিক জেলা গঠন এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব ও বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
১৭৮৬ সালের ৪ এপ্রিল তৎকালীন বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেট টিলম্যান হেঙ্কেল সরকারের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজস্ব-সংক্রান্ত সদর দপ্তর কলকাতায় থাকায় দূরত্বের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের জটিলতা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন। জনগণের সুবিধা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিচারকের দায়িত্বের সঙ্গে কালেক্টরের দায়িত্ব যুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। সরকার তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করলে ১৭৮৬ সালে যশোর কালেক্টরেট প্রতিষ্ঠিত হয়। টিলম্যান হেঙ্কেল হন যশোরের প্রথম কালেক্টর।
প্রথমদিকে যশোর কালেক্টরেটের কার্যক্রম চলত মুড়লীর একটি পুরোনো কুঠিবাড়িতে। পরে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ১৭৯৩ সালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় মুড়লী থেকে কসবায় স্থানান্তর করা হয়। এর কয়েক বছর পর ১৮০১ সালে কসবায় নির্মিত হয় কালেক্টরের প্রথম নিজস্ব স্থায়ী প্রশাসনিক কার্যালয়। বর্তমানের পরিত্যক্ত সাব-রেজিস্ট্রার অফিস হিসেবেও যে ভবনটি পরিচিত, সেটিই যশোরের পুরাতন কালেক্টরেট ভবন।
১৮০১ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৫ বছর এই ভবন ছিল যশোর জেলার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখান থেকেই জেলার ভূমি রাজস্ব সংগ্রহ, দেওয়ানি প্রশাসন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
এই ভবনের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের স্নাতকদের একজন হিসেবে বি.এ. ডিগ্রি অর্জনের পর মাত্র ২০ বছর বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে যোগ দেন। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর। ১৮৫৮ সালের ২৩ আগস্ট তিনি যশোরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের সেই শুরুর দিনে যে ভবনে তিনি দাপ্তরিক কাজ করেছিলেন, সেটিই আজকের পুরাতন কালেক্টরেট ভবন।
অর্থাৎ ভবনটির একটি কক্ষ শুধু ব্রিটিশ আমলের একজন সরকারি কর্মকর্তার কর্মস্থল ছিল না, সেটি ছিল পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীর কর্মজীবনের প্রথম অফিস। যশোরে অবস্থানকালে বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তিজীবনেও নেমে আসে গভীর শোক। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর প্রথম স্ত্রী মোহিনী দেবীর মৃত্যু হয়। যশোরে কর্মরত থাকার সময়ই নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। ফলে যশোরের এই পুরোনো ভবনটি বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে আছে।
স্থাপত্যের দিক থেকেও ভবনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত একতলা এই ভবনের দৈর্ঘ্য উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৭০ মিটার এবং প্রস্থ পূর্ব-পশ্চিমে ১৪ দশমিক ৭০ মিটার। উচ্চতা প্রায় ৮ মিটার। ছোট-বড় মিলিয়ে ভবনটিতে রয়েছে ১৪টি কক্ষ। চুন-সুরকির মশলা এবং ব্রিটিশ আমলের ইট দিয়ে নির্মিত ভবনটির নির্মাণশৈলীতে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের নানা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
ভবনটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের একটি হলো ভল্টেড টানেল আকৃতির উঁচু প্ল্যাটফর্ম। পূর্বমুখী ভবনের সামনের পোর্টিকোর সঙ্গে ছয়টি দৃষ্টিনন্দন গোথিক পিলার রয়েছে। আধাগোলাকার খিলানযুক্ত দরজা, খড়খড়ি ও কাচের পাল্লা, কাঠের বীম, কড়ি-বর্গা ও টালি-ছাদ- সব মিলিয়ে ভবনটির নির্মাণশৈলীতে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যরীতির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট।
ভবনের সামনে ছয় ধাপের ফ্লাইট-স্টেপ আকৃতির সিঁড়ি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পশ্চিম দিকের কক্ষগুলোর ব্যবহারের সুবিধার জন্য ভবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও একগুচ্ছ সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে ভবনটিতে সংস্কার ও পরিবর্তনের চিহ্নও রয়েছে। সিঁড়ি, সানসেড, কার্নিশ, দরজা-জানালার পরিবর্তন ছাড়াও ব্যাবহারিক প্রয়োজন মেটাতে টয়লেট নির্মাণ, কক্ষের রূপান্তর, সম্প্রসারণ ও অন্যান্য পরিবর্তন করা হয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে ভবনটির অবস্থা এখন নাজুক হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ছাদ ও দেয়ালে আগাছা জন্মেছে। সামনের পোর্টিকোর একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। রেকর্ড রুমের ছাদ ধসে পড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে কক্ষে বসে তাঁর দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই কক্ষটিও আংশিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত। ভবনটির বিভিন্ন অংশে পানি চুয়ানো, কাঠামোগত ক্ষয়, প্লাস্টার খসে পড়া, স্যাঁতসেঁতে অবস্থা ও ভিত্তির দুর্বলতার মতো সমস্যার কথাও পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতে, ভবনটির মূল কাঠামো এখনো মোটামুটি অক্ষত রয়েছে। ফলে এখনই যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য অনেকটাই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু অবহেলা অব্যাহত থাকলে ভবনটির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সংরক্ষণের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ১৮০১ সালে নির্মিত এই ভবন যশোরের প্রথম স্থায়ী কালেক্টরেট ভবন। ব্রিটিশ শাসনের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রাথমিক পর্যায়ের সাক্ষ্য বহন করছে এটি। প্রায় ৮৫ বছর এখান থেকে জেলার রাজস্ব, বিচার ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কর্মস্থল হিসেবে ভবনটি বাংলা সাহিত্য ও জাতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।
স্থাপত্যগত কারণেও ভবনটির সংরক্ষণ জরুরি। চুন-সুরকি, পুরোনো ব্রিটিশ ইট, গোথিক পিলার, আধা গোলাকার খিলান, কাঠের বীম, কড়ি-বর্গা ও টালি-ছাদসহ ভবনটির নির্মাণশৈলী ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক স্থাপত্যের একটি মূল্যবান উদাহরণ। ভল্টেড টানেল আকৃতির প্ল্যাটফর্ম এবং ১৪ কক্ষবিশিষ্ট আয়তাকার পরিকল্পনাও ভবনটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবনটির বয়স। ১৮০১ সালে নির্মিত হওয়ায় এর বয়স দুই শতাব্দীরও বেশি। ফলে এটি সাধারণ পুরোনো ভবনের পর্যায়ে নেই; বরং ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসন, স্থাপত্য এবং যশোরের নগর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।
ভবনটি সংরক্ষিত হলে যশোরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত কর্মস্থল হিসেবে এটিকে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ভবনের ইতিহাস, বঙ্কিমচন্দ্রের যশোর জীবন, ব্রিটিশ প্রশাসন এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্য নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ প্রদর্শনী বা জাদুঘর স্থাপন করা গেলে শিক্ষার্থী, গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য এটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে তাই ভবনটিকে ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করে যথাযথ সংরক্ষণ, পুনঃস্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ১৯৬৮ সালের প্রত্নতত্ত্ব আইন (সংশোধিত ১৯৭৬)-এর সংশ্লিষ্ট ধারার আলোকে ভবনটির সংরক্ষণযোগ্যতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।


























