রোববার ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপকূলে ছত্রাক প্রভাবে বিপন্ন নারকেল

প্রতিনিধি, ফকিরহাট (বাগেরহাট)

প্রকাশিত: ১৩:৩৩, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৩:৩৩, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উপকূলে ছত্রাক প্রভাবে বিপন্ন নারকেল

একসময় উপকূলীয় জনপদের বাড়ির উঠান, বাগান, সড়কের পাশ ও মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে ছিল সারি সারি নারকেলগাছ। বাগেরহাটের ফকিরহাট ছিল নারকেল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান এলাকা। কিন্তু রোগ-পোকা, ছত্রাক, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাতে কমছে গাছের ফলন। একই সঙ্গে কাঁচা ডাব হিসেবে অধিকাংশ নারকেল বিক্রি হয়ে যাওয়ায় পরিপক্ব নারকেলের সংকটও তীব্র হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফকিরহাটে নারকেল উৎপাদন হয়েছিল ৪ হাজার ৬০০ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে ৪ হাজার ৫০ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার টনে নেমেছে। এক দশকে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। তবে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দুই দশকে অনেক গাছে ফলন কমেছে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
সম্প্রতি ফকিরহাটের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির বাগান, মাছের ঘের ও সড়কের পাশে এখনও অসংখ্য নারকেলগাছ রয়েছে। তবে অনেক গাছেই পাতায় কালো দাগ ও সাদা আবরণ দেখা যাচ্ছে। কমে গেছে পাতার সংখ্যাও। ফলে গাছ থাকলেও আগের মতো ফলন হচ্ছে না।

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় বাগেরহাটে রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাইয়ের ব্যাপক সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২১-২২ সালের এক গবেষণায় জেলার প্রায় ৯৭ শতাংশ নারকেলগাছ এ পোকার আক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। পোকাটি পাতায় সাদা আবরণ তৈরি করে এবং পরে কালো ছত্রাকের আস্তরণ তৈরি হতে সহায়তা করে। এতে গাছের সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফকিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল হোসেন বলেন, একটি সুস্থ নারকেলগাছে সাধারণত প্রায় ৩৬টি পাতা থাকে। অথচ অনেক গাছে এখন মাত্র ১৫-২০টি পাতা রয়েছে।
কৃষক জিন্নাত শেখ বলেন, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকেই নারকেলের উৎপাদন কমতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আইলা, আম্পান ও ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং রোগ-পোকার আক্রমণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

প্রায় ২০০টি নারকেলগাছ রয়েছে জিন্নাত শেখের। তাঁর ভাষ্য, সাত-আট বছর আগে এসব গাছ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হতো। এখন আয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকায়।
ফলন কমার প্রভাব পড়েছে ফকিরহাটের ঐতিহ্যবাহী নারকেল বাজারে। স্থানীয় পাইকারদের মতে, একসময় প্রতি রবি ও বুধবার বাজারে লাখ লাখ নারকেল কেনাবেচা হতো। এখন বেচাকেনা সীমিত হয়ে এসেছে মাত্র দুই গলিতে।
পাইকার নিত্যানন্দ দাস, আলী শেখ ও শেখ হাফিজুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর আগেও একজন ব্যবসায়ী দিনে ৮-১০ হাজার নারকেল কিনতেন। এখন তাঁরা কিনছেন মাত্র ১ হাজার থেকে দেড় হাজার।
দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। পাঁচ-ছয় বছর আগে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি নারকেলের দাম এখন আকারভেদে ১৩০-১৬০ টাকা।

নারকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় শিল্পেও। গ্র্যান্ড অটো নারকেল তেল মিলের মালিক স্বপন কুমার বসু বলেন, ২০০৩ সালের দিকে বাগেরহাটে প্রায় ১০৯টি নারকেল তেল মিল ছিল। কাঁচামালের সংকটে এর মধ্যে শতাধিক বন্ধ হয়ে গেছে।

তাঁর দাবি, উৎপাদিত নারকেলের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন কাঁচা ডাব হিসেবে বিক্রি হয়। কোভিড-১৯ মহামারি ও ডেঙ্গুর সময় ডাবের চাহিদা বাড়ায় পরিপক্ব হওয়ার আগেই নারকেল বিক্রির প্রবণতা আরও বেড়েছে।
নারকেলের সংকট শুধু কৃষি ও বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় এলাকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিতেও।
গৃহিণী বিশাখা দাস বলেন, আগে নারকেলের দুধ দিয়ে ডিমের কোরমা ও মাছ রান্না করা হতো। কোরানো নারকেল দিয়ে তৈরি হতো চিংড়ির বড়া, পাটুরি, নাড়ু, পুলি ও ভাপা পিঠা। এখন নারকেলের দাম বেশি হওয়ায় উৎসব ছাড়া এসব খাবার তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নারকেলগাছে রোগ-পোকা দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তবে কৃষি অফিসের লজিস্টিক সহায়তা সীমিত। গত বছর ৩০ জন গাছি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ বছর ৮০০ কৃষককে নারকেলের চারা দেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতাহার হোসেন বলেন, গাছের বয়স, সুষম সার ব্যবহারের ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাদামাছির আক্রমণ নারকেল উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাইনুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে পোকামাকড় ও ছত্রাকজনিত রোগ নারকেল উৎপাদনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: