রোববার ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মরিচের চারা তৈরির এখনই সময়

রানার কৃষি

প্রকাশিত: ১৫:৫২, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মরিচের চারা তৈরির এখনই সময়

মরিচ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মসলা ফসল। সারা বছরই এর চাহিদা থাকায় কৃষকের কাছে মরিচ একটি লাভজনক ফসল হিসেবে বিবেচিত। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে শুরুতেই ভালো চারা তৈরি করা জরুরি। রবি মৌসুমের মরিচ চাষের জন্য এখন থেকেই বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিতে হবে। মানসম্মত বীজ, সঠিক বীজতলা, পরিমিত সেচ এবং রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনায় যত্নবান হলে সুস্থ ও সবল চারা তৈরি করা সম্ভব। এনিয়ে রানার কৃষির নিয়মিত আয়োজনে পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।

চারা তৈরির প্রথম ধাপ হলো মানসম্মত বীজ নির্বাচন। কৃষককে ভালো জাতের বিশুদ্ধ, পরিপক্ব ও রোগমুক্ত বীজ সংগ্রহ করতে হবে। সম্ভব হলে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বা বিশ্বস্ত বীজ বিক্রেতার কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত। পুরোনো, ভেজা বা বিবর্ণ বীজ ব্যবহার না করাই ভালো।
নিজের উৎপাদিত বীজ ব্যবহার করলে আগের মৌসুমের সুস্থ ও সবল গাছ থেকে পাকা মরিচ সংগ্রহ করে বীজ তৈরি করতে হবে। বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ভালো কি না, সেটিও পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার।

বীজ শোধন করুন
বীজবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে বপনের আগে বীজ শোধন করা প্রয়োজন। মরিচের বীজ শোধনের ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। ওষুধ ব্যবহারের আগে প্যাকেটের লেবেলে দেওয়া ফসল, রোগ এবং মাত্রা অবশ্যই দেখে নিতে হবে।
বালাইনাশকের মাত্রা নিজের মতো করে বাড়ানো যাবে না। প্রয়োজন হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে। বীজ শোধনের পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বীজ শুকিয়ে নিয়ে বীজতলায় বপন করতে হবে।

উঁচু ও সুনিষ্কাশিত বীজতলা
মরিচের চারা তৈরির জন্য এমন জায়গা নির্বাচন করতে হবে যেখানে পানি জমে না। বর্ষার পানি বা সেচের পানি জমে থাকলে কচি চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উঁচু ও সুনিষ্কাশিত জায়গায় বীজতলা তৈরি করা ভালো।
বীজতলার মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। পচা জৈবসার বা কম্পোস্ট মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আগের ফসলের রোগাক্রান্ত গাছের অংশ বা আগাছা বীজতলায় রাখা যাবে না।
বীজ খুব ঘন করে বপন করা উচিত নয়। সারিতে অল্প দূরত্ব রেখে বীজ বপন করলে চারা পরিচর্যা সহজ হয় এবং আলো-বাতাস ভালোভাবে চলাচল করতে পারে।

সেচে সতর্কতা
বীজ গজানোর সময় মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকা জরুরি। তবে অতিরিক্ত পানি দেওয়া যাবে না। বীজতলায় পানি জমে গেলে বীজ পচে যেতে পারে এবং চারার গোড়া পচা রোগ দেখা দিতে পারে।
সেচের সময় প্রবলভাবে পানি না দিয়ে হালকা সেচ দিতে হবে। বৃষ্টির সময় বীজতলায় পানি জমছে কি না, নিয়মিত দেখতে হবে। পানি জমলে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রয়োজনে অতিবৃষ্টি থেকে বীজতলা রক্ষার জন্য অস্থায়ী ছাউনি দেওয়া যেতে পারে। তবে চারা গজানোর পর পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

গোড়া পচা ও ঢলে পড়া রোগ
মরিচের কচি চারায় গোড়া পচা ও ঢলে পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত চারা প্রথমে দুর্বল হয়ে যায়। পরে মাটির কাছের অংশ পচে গিয়ে চারা ঢলে পড়ে এবং মারা যেতে পারে।
বীজতলায় অতিরিক্ত আর্দ্রতা, পানি জমে থাকা, ঘন করে বীজ বপন এবং অপরিষ্কার বীজতলা এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই আক্রান্ত চারা দ্রুত তুলে বীজতলা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে।
রোগের লক্ষণ দেখা দিলে নিজের মতো করে ছত্রাকনাশক ব্যবহার না করে উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে রোগ শনাক্ত করা উচিত। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।

চারায় পোকামাকড়ের আক্রমণ
মরিচের কচি চারায় জাবপোকা, থ্রিপসসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ হতে পারে। এসব পোকা কচি পাতা ও গাছের রস শোষণ করে চারাকে দুর্বল করে দেয়। আক্রান্ত পাতায় কুঁকড়ে যাওয়া বা বিকৃতির লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তাই বীজতলা প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা দরকার। আক্রান্ত পাতা বা চারা আলাদা করে নষ্ট করতে হবে। পোকার উপস্থিতি দেখলেই কীটনাশক প্রয়োগ করা ঠিক নয়। প্রথমে পোকার ধরন ও আক্রমণের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
আক্রমণ বেশি হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পোকার জন্য অনুমোদিত কীটনাশক নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। একই ওষুধ বারবার ব্যবহার না করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ভালো।

চারার পরিচর্যা
চারা গজানোর পর বীজতলায় নিয়মিত নজর দিতে হবে। অতিরিক্ত ঘন চারা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী পাতলা করে দিতে হবে। এতে প্রতিটি চারা পর্যাপ্ত আলো, বাতাস, পানি ও পুষ্টি পাবে।
আগাছা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। আগাছা চারার সঙ্গে পানি ও পুষ্টির জন্য প্রতিযোগিতা করে। একই সঙ্গে আগাছায় বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা আশ্রয় নিতে পারে।
অতিরিক্ত সার প্রয়োগও করা যাবে না। চারার প্রয়োজন অনুযায়ী সার দিতে হবে। বিশেষ করে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া প্রয়োগে চারা নরম ও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং রোগ-পোকার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মূল জমিতে চারা রোপণ
চারা পর্যাপ্ত সবল হলে মূল জমিতে রোপণের প্রস্তুতি নিতে হবে। চারা তোলার আগে হালকা সেচ দিলে মাটি নরম হয় এবং শিকড়ের ক্ষতি কম হয়। রোগাক্রান্ত, দুর্বল বা অতিরিক্ত ছোট চারা বাদ দিতে হবে।
মূল জমি অবশ্যই সুনিষ্কাশিত হতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকলে মরিচের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় জৈবসার ও অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
চারা রোপণের সময় জাতভেদে উপযুক্ত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। চারা খুব গভীরে রোপণ করা যাবে না। রোপণের পর প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা সেচ দিতে হবে।

কৃষকের প্রতি পরামর্শ
মরিচের ফলন ভালো করার প্রস্তুতি শুরু হয় চারা তৈরির সময় থেকেই। তাই মানসম্মত বীজ নির্বাচন, বীজ শোধন, উঁচু ও সুনিষ্কাশিত বীজতলা, পরিমিত সেচ এবং নিয়মিত রোগ-পোকা পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রোগ বা পোকা দেখা দেওয়ার পর অজ্ঞতাবশত ওষুধ প্রয়োগ না করে প্রথমে সমস্যাটি শনাক্ত করা জরুরি। কারণ একই লক্ষণ বিভিন্ন রোগ বা পোকার কারণে হতে পারে। ভুল বালাইনাশক ব্যবহার করলে খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফসল, মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।

সুস্থ চারা মানেই ভালো ফসলের প্রথম ধাপ। তাই চারা তৈরির শুরু থেকে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। কোনো রোগ বা পোকার আক্রমণ শনাক্ত করতে সমস্যা হলে আক্রান্ত গাছ বা পাতার নমুনা নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে নিরাপদ, মানসম্মত ও লাভজনক মরিচ উৎপাদনের পথ সহজ হবে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: