রোববার ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে বাড়ছে বাণিজ্যিক চাষ 

কচুর লতিতে কৃষকের ভাগ্যবদল

উবাঈদ সামি

প্রকাশিত: ১৪:১৫, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কচুর লতিতে কৃষকের ভাগ্যবদল

সবজি চাষে খ্যাত যশোরে বাণিজ্যিকভাবে কচুর লতি চাষ বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠে অন্যান্য সবজির পাশাপাশি কচুর লতির আবাদও ছড়িয়ে পড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে কম খরচে ভালো লাভ পাওয়ায় এ ফসলে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা।

উৎপাদিত লতি স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পাইকারদের মাধ্যমে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ধানসহ অন্যান্য ফসলের তুলনায় তুলনামূলক ভালো দাম ও দীর্ঘ সময় ধরে ফলন পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেক কৃষক লতি চাষকে লাভজনক বিকল্প হিসেবে দেখছেন।

চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা, পাশাপোল ও সিংহঝুলি; বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা, জহুরপুর ও রায়পুর; শার্শার ডিহি, কায়বা ও নাভারণ; ঝিকরগাছার বাঁকড়া ও মাগুরা; মনিরামপুরের নেহালপুর, হরিহরনগর ও মনোহরপুর; কেশবপুরের পাঁজিয়া ও সুফলাকাঁটি; যশোর সদরের চুরামনকাটি, কাশিপুর, ইচালি, দেয়াড়া, লেবুতলা ও সাতমাইল এবং অভয়নগরের সিদ্দিরপাশা ও প্রেমবাগ ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে এখন কচুর লতির আবাদ দেখা যাচ্ছে।
একসময় এসব জমির বড় অংশে ধান চাষ হলেও এখন কিছু জমিতে জায়গা করে নিয়েছে কচুর লতি। কৃষকদের মতে, নিয়মিত পরিচর্যা করলে দীর্ঘ সময় ধরে এ ফসল থেকে ফলন পাওয়া যায়।

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবুল হাসান বলেন, ‘যশোরে সবজি চাষ বরাবরই সমৃদ্ধ। চলতি মৌসুমে আগাম সবজি খরিপ-২-এর আওতায় জেলায় মোট ৬ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কচুর লতি চাষ হয়েছে। মাটি উর্বর হওয়া এবং কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার কারণে লতির ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সঠিক সময়ে সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষকদের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

যশোর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত পুলের হাট বাজারে প্রতিদিন কচুর লতির বেচাকেনা হয়। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার হাটের নির্ধারিত দিন হলেও অন্যান্য দিনও সেখানে লতির কেনাবেচা চলে।
বাঘারপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকরা ভোরে ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনে লতি নিয়ে আসেন। পুলের হাটের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন বাজারেও চলে এর বেচাকেনা।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিদিন পুলের হাট থেকে কয়েক হাজার মণ কচুর লতি বেচাকেনা হয়। ভোর থেকে শুরু হওয়া কেনাবেচায় শ্রমিকরা লতি বস্তাবন্দী করে ট্রাকে তোলেন। চুরামনকাটি, সাতমাইল, আব্দুলপুর, চৌগাছা কাঁচাবাজার ও বাঁকড়ার হাট থেকেও দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা লতি সংগ্রহ করেন। পরে এসব লতি পাঠানো হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন বড় পাইকারি বাজারে।
লতি চাষে কৃষকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ লাভজনকতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ও ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কৃষক বিকল্প ফসল হিসেবে লতি চাষ বেছে নিচ্ছেন।
চৌগাছার ফুলসারা গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে জমিতে নিয়মিত ধান চাষ করতাম। কিন্তু একবার টানা বর্ষায় ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়। এরপর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে পরীক্ষামূলকভাবে কচুর লতি চাষ শুরু করি। প্রথম বছরেই প্রত্যাশার চেয়ে ভালো লাভ পাই। এরপর থেকে ধান ছেড়ে পুরোদমে লতি চাষেই মন দিয়েছি। বাজারে অন্য যেকোনো সবজির চেয়ে লতির দাম বেশি ও স্থিতিশীল থাকে, তাই ঝুঁকি অনেক কম।’


একই এলাকার কৃষক প্রদীপ কুমার রায় বলেন, ধান চাষের তুলনায় লতি চাষে শারীরিক পরিশ্রম কিছুটা বেশি হলেও আর্থিকভাবে এটি লাভজনক।
তিনি বলেন, ‘চলতি মৌসুমে ৪৫ শতক জমিতে কচুর লতি চাষে সার, চারা ও পরিচর্যা বাবদ প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ টাকার লতি বিক্রি করেছি। সব খরচ বাদ দিয়েও নিট লাভ থাকছে ৬০ হাজার টাকা। কম সময়ে এত অল্প খরচে অন্য কোনো ফসল থেকে এত টাকা আয় করা সম্ভব নয়।’

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, যশোরের মাটি ও আবহাওয়ায় উৎপাদিত কচুর লতির মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে।
পুলের হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতারা যশোরের লতির জন্য মুখিয়ে থাকেন। এখানকার লতি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। ফলে ঢাকা বা অন্যান্য অঞ্চলের বাজারে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটি বিক্রি হয়ে যায়। পণ্যের চাহিদা ও গুণগত মান ভালো বলেই আমরা কৃষকদের ভালো দাম দিতে পারি।’

বাঘারপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান বলেন, ‘আগে এই অঞ্চলের বন্দবিলায় হাতেগোনা চার-পাঁচজন কৃষক লতি কচু চাষ করতেন। কিন্তু মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা প্রমাণ হওয়ার পর এখন প্রায় শতভাগ উপযুক্ত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লতি কচুর চারা যাচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে কৃষকদের সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো ওষুধ প্রয়োগ এবং আধুনিক পরিচর্যা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।’

কৃষক, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, যশোরে কচুর লতি চাষ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক রূপ পাচ্ছে। বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম ধরে রাখা গেলে ভবিষ্যতে এ আবাদ আরও বাড়তে পারে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: