রোববার ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের মাটিতে জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন 

উবাঈদ সামি

প্রকাশিত: ১৫:০৬, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যশোরের মাটিতে জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন 

যশোরের চৌগাছা উপজেলার হিজলী গ্রাম। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে গাছে ধরে আছে আপেল কিংবা পাকা গাব। তবে কাছে গেলেই ধারণা বদলে গেলো।  
দেখতে আপেলের মতো, রঙে কমলার আভা। খেতে মিষ্টি, পুষ্টিগুণে ভরপুর। এ যেন একসাথে আপেল-গাব আর খেজুরের স্বাদ। জাপানের এই জাতীয় ফল পার্সিমনের চাষ হচ্ছে উপজেলার হিজলী গ্রামে। আর এর নেপথ্যের কারিগর হিজলী গ্রামের কৃষক জুলফিকার সিদ্দীক। যিনি ইতিমধ্যে লাভবানও হয়েছেন । 

আলাপচারিতায় জুলফিকার সিদ্দীক জানালেন, ২০২১ সালে নাটোর থেকে পার্সিমনের চারা কিনে ৫ কাঠা জমিতে লাগান ৩০টি গাছ। প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত পরিচর্যার পর গাছে ফল আসতে শুরু করে। চলতি মৌসুমে এসব গাছে প্রচুর পার্সিমন ধরেছে । গাছের ডালে ডালে ঝুলছে ফল, দেখেই বোঝা যায় বাম্পার ফলন হয়েছে।

তিনি আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, ‘এমন একদিন আসবে, যখন পার্সিমন কাঁচাতেই মিষ্টি পাবেন। এগুলো ফল দু-একটা করে ধরতে শুরু করেছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ও টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা তৈরি করে আমাদের দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’

জুলফিকার সিদ্দীক নিজেও চারা উৎপাদন করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমার মাধ্যমে আরও ১০০ জন কৃষক এই চাষে আসুক। সরকার যদি প্রশিক্ষণ ও চারা সহায়তা দেয়, তাহলে ৩ বছরের মধ্যে যশোরে পার্সিমনের বড় বাগান হবে।’

জুলফিকারের বাগানে ফল ধরার খবর ছড়িয়েছে আশপাশের গ্রামে। প্রতিদিনই পার্সিমন দেখতে আসছেন অনেকে। আপেলের মতো দেখতে আকর্ষণীয় এই ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।
দর্শনার্থী মনিরুজ্জামান উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক ফল দেখেছি কিন্তু এই ফল অনেক মজা ও সুস্বাদু। গাছে কুলের মতো ফল ধরে যেটা দেখে হৃদয় জুড়িয়ে যায়। জাপানের জাতীয় ফল এ দেশে খেতে পেরে আমরা গর্বিত।’

অনেকেই বাগান থেকে ঘুরে গিয়ে চারা সংগ্রহের কথা ভাবছেন। কৃষকদের মধ্যে নতুন এই ফল নিয়ে কৌতূহল ও আগ্রহ দুটোই বাড়ছে।
শুধু হিজলী নয়, যশোরের বিভিন্ন এলাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে পার্সিমনের চাষ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা। মানভেদে প্রতি কেজি পার্সিমন বিক্রি হচ্ছে আটশ থেকে ১ হাজার টাকায়।
দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি এখনো দুর্লভ ফল। চাহিদা আছে কিন্তু সরবরাহ কম। তাছাড়া ফলটির স্বাদ ও পুষ্টিগুণ শহরের ক্রেতাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, ‘একজনই চাষ করেছেন। তিনি মোটামুটি সফল। আমাদের যে গবেষণা এবং লিংকেজ ওয়ার্কশপ, সেখানে আমরা এটা উপস্থাপন করেছি। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে যদি আমাদের অ্যাপ্রুভ করা হয়, তাহলে আমরা এটি নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে কাজ করতে সক্ষম হবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটার নতুন করে বাজার সৃষ্টি করতে পারলে, কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারলে স্ট্রবেরি বা ড্রাগনের মতো বিপ্লব ঘটবে। যশোরের মাটি সবজির জন্য বিখ্যাত। এখানে ফল চাষেও ভালো সম্ভাবনা আছে।’

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পার্সিমন চাষের জন্য আলাদা কোনো কঠিন প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। সাধারণ ফল বাগানের মতোই পরিচর্যা করলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে জাত নির্বাচন ও সঠিক সময়ে ছাঁটাই খুব জরুরি।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর ইসলাম বলেন, ‘পার্সিমন জাপানের জাতীয় ফল। এটিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, আয়রণ, পটাশিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। নিয়মিত পার্সিমন খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। চোখ ও ত্বকের জন্য ভালো। ফাইবার বেশি থাকায় হজমেও সাহায্য করে। জাপান, কোরিয়া ও চীনে এটি খুবই জনপ্রিয় একটি ফল। আমাদের দেশের মানুষও ধীরে ধীরে এটি গ্রহণ করবে।’

ড. তানভীর আরও জানান, পার্সিমনের দুই ধরনের জাত আছে। একটি পাকলে নরম হয়ে যায়, আরেকটি কচকচে অবস্থায়ও খাওয়া যায়। বাংলাদেশে এখন যে জাতটি চাষ হচ্ছে সেটি পাকলে নরম ও রসালো হয়।’
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্সিমন গাছ খরা সহনশীল। বেশি পানি জমে থাকা পছন্দ করে না। যশোরের উঁচু ও পানি নিষ্কাশন ভালো এমন জমিতে এটি ভালো হবে। তাছাড়া গাছে রোগ-বালাই কম। কীটনাশকের ব্যবহারও তুলনামূলক কম লাগে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, অ্যাভোকাডোর মতো পার্সিমনও হতে পারে যশোরের নতুন অর্থকরী ফসল। একবার গাছ লাগালে ২০-২৫ বছর ফল দেয়। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। 


 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: