১৮৩০ সালের যশোর। শহর তখন আজকের মতো ব্যস্ত নয়। রাস্তায় যানবাহনের ভিড় নেই, নেই বিদ্যুতের আলো, নেই নগরের কোলাহল। সন্ধ্যা নামলে শহর অনেকটাই নীরব হয়ে আসে। সেই যশোরেরই কোনো এক বিকেলে গাড়িতে চড়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন তৎকালীন যশোরের জজ মিস্টার প্রিঙ্গলের স্ত্রী ক্রিশ্চিয়ানা প্রিঙ্গল। যশোর থেকে ইংল্যান্ডের বাড়িতে লেখা তাঁর সাতটি চিঠির একটিতে হঠাৎ ধরা পড়ে যায় প্রায় দুইশ বছর আগের যশোরের একটি জীবন্ত দৃশ্য।
১৮৩০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লেখা সেই চিঠিতে ক্রিশ্চিয়ানা লিখেছিলেন, আগের সন্ধ্যায় তাঁরা গাড়ি করে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। পথের মধ্যে বিক্রির জন্য রাখা কয়েকটি হাতি দেখতে পান। আর সেখানেই দেখা হয়ে যায় যশোরের তরুণ রাজা বরদাকান্ত রায়ের সঙ্গে।
ক্রিশ্চিয়ানা তাঁর বয়স অনুমান করেছিলেন উনিশ বছর। তরুণ রাজাকে তাঁর চোখে বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। তাঁর বর্ণনায়, বরদাকান্ত দেখতে সুন্দর, আচরণে একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো। তাঁর চোখ দুটি বড়, হাত ও চুল ছিল কৃশকায়। এত অল্প কয়েক মুহূর্তের সাক্ষাৎ, অথচ একজন বিদেশিনি ইংরেজ নারীর চোখে যশোরের তরুণ জমিদারের যে চেহারাটি ধরা পড়েছিল, তা আজও ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল হয়ে আছে।
বরদাকান্ত তাঁকে তাঁর প্রাসাদে যাওয়ার আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। ক্রিশ্চিয়ানা তখন তাঁকে বলেছিলেন, সেদিন আর সময় হবে না, অন্য একদিন তাঁরা যাবেন। কথোপকথনের এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন সেই সময়ের যশোরের সামাজিক জীবনের একটি দরজা খুলে দেয়। একদিকে ব্রিটিশ শাসনের প্রশাসনিক কেন্দ্র- জজ, কালেক্টর, সরকারি কর্মকর্তা; অন্যদিকে স্থানীয় জমিদার ও রাজপরিবার। তাঁদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগও ছিল।
বরদাকান্ত রায়ের পিতা রাজা বাণীকণ্ঠ রায় ১৮১৭ সালে মারা যান। তখন বরদাকান্তের বয়স মাত্র তিন বছর। ফলে পিতার মৃত্যুর পর এত বড় জমিদারির দায়িত্ব তাঁর ছোট্ট কাঁধে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। জমিদারি চলে যায় সরকারি তত্ত্বাবধানে। নাবালক উত্তরাধিকারী হিসেবে বরদাকান্তের জমিদারি পরিচালিত হতে থাকে ঈড়ঁৎঃ ড়ভ ডধৎফং-এর ব্যবস্থায়।
অর্থাৎ ১৮৩০ সালে যখন ক্রিশ্চিয়ানা প্রিঙ্গল তাঁকে দেখছেন, তখন তিনি চাঁচড়া জমিদারির উত্তরাধিকারী হলেও নিজের জমিদারি পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব তাঁর হাতে ছিল না। বয়সের হিসাবে তিনি তখন তরুণ- প্রায় উনিশ বছরের। কিন্তু তাঁর সামনে পড়ে ছিল একটি বিশাল জমিদারি, একটি পুরনো রাজপরিবারের ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ধরে রাখার কঠিন লড়াই।
১৮৩৪ সালে বরদাকান্ত বয়ঃপ্রাপ্ত হন। এরপর যশোরের কালেক্টরের সহায়তায় তিনি জমিদারির কাজ নিজ হাতে গ্রহণ করেন। জমিদারি হাতে নেওয়ার পর তাঁর জীবন আর কেবল রাজকীয় প্রাসাদ, হাতি-ঘোড়া কিংবা জমিদারি আভিজাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জমিদারি রক্ষা ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য তাঁকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে নামতে হয়।
বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার মধ্য দিয়ে তিনি জমিদারির হারানো অংশের কিছু পুনরুদ্ধারও করেছিলেন। সেই সময়ের জমিদারি ব্যবস্থা, ভূমির মালিকানা এবং আদালতকেন্দ্রিক বিরোধের ইতিহাসের সঙ্গে বরদাকান্ত রায়ের জীবনও গভীরভাবে জড়িয়ে যায়।
কিন্তু ১৮৩০ সালের সেই বিকেলের দৃশ্যটির সঙ্গে পরবর্তী জীবনের এই কঠিন বাস্তবতার যেন কোনো মিল নেই। ক্রিশ্চিয়ানা প্রিঙ্গলের চোখে তখন তিনি কেবল একজন তরুণ রাজা- সুন্দর চেহারা, বড় বড় চোখ, ভদ্র ব্যবহার, আর অতিথিদের নিজের প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার আন্তরিক আগ্রহ।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, চিঠিতে ক্রিশ্চিয়ানা লিখেছিলেন- যশোরে দেখার মতো তেমন কিছু নেই। এমন কোনো জিনিসও তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না, যা ইংল্যান্ডে থাকা প্রিয়জনকে পাঠাতে পারেন।
আজকের যশোরের দিকে তাকালে এই মন্তব্যটি বিস্ময় জাগায়। যে যশোর এখন ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অসংখ্য স্মৃতি বহন করে, ১৮৩০ সালের এক ইংরেজ নারীর চোখে সেই শহর ছিল প্রায় নিস্তরঙ্গ। অথচ তাঁর অজান্তেই তিনি যে জিনিসটি ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, সেটিই হয়ে উঠেছে যশোরের ইতিহাসের এক অমূল্য স্মারক- একটি চিঠি।
সেই চিঠির কয়েকটি লাইনে ধরা পড়ে আছে হাতি বিক্রির দৃশ্য, গাড়িতে চড়ে সন্ধ্যার ভ্রমণ, এক তরুণ জমিদারের সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ এবং ঔপনিবেশিক যশোরের সামাজিক জীবনের একটি ক্ষণিক ছবি।
বরদাকান্ত রায় তখনও জানতেন না তাঁর জীবনের সামনে কী অপেক্ষা করছে। কয়েক বছর পর তিনি নিজের জমিদারি হাতে নেবেন, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়বেন, হারানো সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করবেন এবং দীর্ঘ ৪৬ বছর চাঁচড়া জমিদারি পরিচালনা করবেন।
১৮৮০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর দেড়শ বছরেরও বেশি সময় পর তাঁর জীবনের একটি সামান্য মুহূর্ত যেন ফিরে আসে সেই পুরনো চিঠির পাতায়। ১৮৩০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির সেই চিঠিতে রাজা বরদাকান্ত রায় আর কেবল ইতিহাসের কোনো নাম নন। তিনি সেখানে মাংস-মজ্জার একজন উনিশ বছরের যুবক- যিনি সন্ধ্যার পথে হাতি দেখতে বেরিয়েছিলেন, একজন ইংরেজ বিচারকের স্ত্রীকে নিজের প্রাসাদে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং যাঁর বড় বড় চোখ, কৃশকায় হাত ও চুল একজন বিদেশিনী নারীর স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছিল।
ইতিহাস কখনো কখনো রাজা-বাদশাহর যুদ্ধ, জমিদারির খতিয়ান কিংবা আদালতের মামলার মধ্যে নয়- একটি ব্যক্তিগত চিঠির কয়েকটি সাধারণ বাক্যের মধ্যেও বেঁচে থাকে। ক্রিশ্চিয়ানা প্রিঙ্গলের সেই চিঠিও তেমনই এক জানালা। সেই জানালা দিয়ে তাকালে প্রায় দুইশ বছর আগের যশোরের এক সন্ধ্যা, বিক্রির জন্য দাঁড়িয়ে থাকা হাতিগুলো এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ রাজা বরদাকান্ত রায়কে যেন আজও দেখা যায়।


























