বর্ষা নামলেই বাঙালির হাতে যে জিনিসটির কথা সবার আগে মনে পড়ে, তার নাম ছাতা। আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামবে- হাতে একটি কালো ছাতা থাকলেই যেন ভরসা। কিন্তু এই ছাতার ইতিহাস শুধু বৃষ্টি ঠেকানোর ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজকীয় মর্যাদা, সাহেবি সংস্কৃতি, কলকাতার নগরজীবন এবং বাঙালির নিজস্ব কারিগরি ঐতিহ্য।
ছাতার ইতিহাস অবশ্য বাঙালির ঘরে আসার অনেক আগের। প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশর ও চীনে ছাতার ব্যবহার ছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। তবে তখনকার ছাতা মূলত বৃষ্টি ঠেকানোর জন্য নয়, প্রখর রোদ থেকে ছায়া পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। ভারতেও বহু প্রাচীনকাল থেকেই ‘ছত্র’ বা রাজছত্রের প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে রাজা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির মাথার ওপর ছত্র ধরার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলা অঞ্চলেও ছাতার ব্যবহার একেবারে নতুন নয়। একসময় রাজা-জমিদার কিংবা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির মাথার ওপর ছাতা ধরে রাখার জন্য আলাদা ছাতাবরদার থাকত। ছাতার আকারও বোঝাত মানুষের সামাজিক অবস্থান। উনিশ শতকের কলকাতায় এমন বিশাল ছাতার প্রচলন ছিল, যার নিচে একজন নয়, কয়েকজন মানুষও আশ্রয় নিতে পারত। বিদ্যাসাগরের ছাত্রজীবনের একটি স্মৃতিতে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চাননের জন্য ভৃত্য কাঁধে বিশাল ছাতা বহন করতেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে সাধারণ বাঙালির হাতে আজকের পরিচিত কাপড়ের কালো ছাতা আসতে শুরু করে মূলত উনিশ শতকে, বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে। তার আগে বাংলার সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতেন দেশীয় ছাতা- তালপাতা, গোলপাতা কিংবা অন্য স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি। বাঁশের দণ্ডের ওপর পাতার ছাউনি দেওয়া সেই ছাতা ছিল সহজ, সস্তা এবং বাঙালির জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেও কলকাতার রথের মিছিলে বড় বড় দেশি পাতার ছাতা দেখা যেত।
এরপর কলকাতায় জনপ্রিয় হতে থাকে বিলিতি ছাতা। ১৮৭৬ সালের তথ্য থেকে জানা যায়, বিলিতি ছাতার চাহিদা তখন চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি পুরোনো ছাতাও কিনে নেওয়ার জন্য ফেরিওয়ালারা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতেন। ১৮৭৭ সালে কলকাতার রামবাগান এলাকায় ‘পুরানা ছাতা বিক্রি’ বলে ফেরিওয়ালার ডাক শোনা যেত। ১৮৯৩-৯৪ সাল নাগাদ কলকাতায় কয়েক লক্ষ বিলিতি ছাতা আমদানি হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষভাগে ছাতা আর কেবল সাহেব কিংবা জমিদারের সামগ্রী ছিল না- ক্রমে তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল।
ছাতার জনপ্রিয়তার পেছনে প্রযুক্তিরও বড় ভূমিকা ছিল। ১৮৫০-এর দশকে ইংরেজ উদ্ভাবক স্যামুয়েল ফক্স ছাতার কাঠামোয় ইস্পাতের হালকা রড ব্যবহারের উন্নতি করেন। ফলে আগের ভারী ছাতার তুলনায় নতুন ছাতা হয়ে ওঠে হালকা, মজবুত এবং সহজে বহনযোগ্য। এর পর থেকেই আধুনিক ছাতার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।
কলকাতায় ছাতা শুধু আমদানি হতো না, একসময় ছাতা তৈরির দেশীয় উদ্যোগও গড়ে ওঠে। ১৮৮২ সালে মহেন্দ্রলাল দত্ত কলকাতার ২৬ নম্বর বেনিয়াটোলা লেনে নিজের বসতবাড়িতে কুটিরশিল্প হিসেবে ছাতা তৈরি শুরু করেন। অর্থাৎ বাঙালির ছাতা ব্যবহারের ইতিহাসের পাশাপাশি বাঙালির ছাতা তৈরির ইতিহাসও উনিশ শতকেই শুরু হয়ে যায়।
বাংলার ছাতার আরেকটি চমৎকার দিক হলো- এটি শুধু ব্যাবহারিক বস্তু ছিল না, লোকজ সংস্কৃতিরও অংশ ছিল। মানভূম অঞ্চলে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে চলে আসা ছাতা-পরব তারই স্মৃতি। সেখানে বিশাল ছাতা তুলে ইন্দ্রদেবের আরাধনা করা হতো। অর্থাৎ ছাতা বাংলার মানুষের কাছে শুধু রোদ-বৃষ্টির আশ্রয় নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে কৃষি, বর্ষা, দেবতা, রাজকীয়তা ও লোকবিশ্বাসের দীর্ঘ ইতিহাস।
পরে ছাতা ঢুকে পড়ে বাঙালির সাহিত্য ও দৈনন্দিন স্মৃতিতেও। রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ-এর সেই পরিচিত ছত্র- ‘বাদল দিনে/ ঘরে যায় ছাতা কিনে’- ছাতাকে যেন বাঙালির বর্ষাকালের চিরন্তন সঙ্গী করে দিয়েছে। ছাতার বাঁট কখনও শিক্ষকের শাসনের প্রতীক, কখনও পথ চলার লাঠি, আবার কখনও বৃষ্টিভেজা গ্রামের মানুষের একমাত্র আশ্রয়।
বাংলাদেশেও ছাতার নিজস্ব ব্যবসা ও কারিগরি ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিল। পুরান ঢাকার চক মোগলটুলিতে ১৯৫৪ সালে তাজউদ্দীন আহমদ ছাতা বিক্রি শুরু করেন; পরে সেখানেই ছাতা তৈরির কাজ গড়ে ওঠে এবং ‘তাজউদ্দীন ছাতা’ নামে দেশীয় ব্র্যান্ডও তৈরি হয়। একসময় ছাতা তৈরির কাজ বাংলাদেশের কুটিরশিল্পেরও অংশ ছিল।
আজ অবশ্য বাজারে চীনা ছাতার আধিপত্য। তবু পুরোনো দিনের সেই বাঁশের হাতলওয়ালা কালো ছাতা, পাতার তৈরি দেশি ছাতা কিংবা লম্বা বাঁটের ছাতার স্মৃতি এখনও বাঙালির কাছে আলাদা।
একসময় রাজা-জমিদারের মাথার ওপর ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকত ছাতাবরদার। তারপর সাহেবের হাতে এল কালো ছাতা। শহরের রাস্তা পেরিয়ে তা পৌঁছে গেল গ্রামের মেঠোপথে। আজ সেই ছাতা ভাঁজ হয়ে ঢুকে যায় অফিস ব্যাগে কিংবা স্কুলপড়ুয়ার ব্যাগে। রাজছত্র থেকে পকেট ছাতা- এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ছাতা শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে বাঙালির বর্ষার সবচেয়ে আপন সঙ্গী।


























