একটি বিদ্যালয় কখনও শুধু কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ, একটি মাঠ কিংবা শিক্ষকদের নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জনপদের স্মৃতি, কয়েক প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস এবং মানুষের স্বপ্ন। যশোর সদরের বসুন্দিয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯১৯ সালে যাত্রা শুরু করে শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়টি বসুন্দিয়া অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি পেরিয়েছে ১০৭ বছরের গৌরবময় পথ; একই সঙ্গে উদযাপন করেছে শতবর্ষ উৎসব।
বসুন্দিয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডা. শরৎচন্দ্র ঘোষের নাম। তাঁর উদ্যোগেই ১৯১৯ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন জিতেন্দ্র মোহন সিংহ। তখন বিদ্যালয়ের জন্য জমি ছিল ৬ দশমিক ৪০ একর। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে বিদ্যালয়টি তার শিক্ষাগত স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করে। ১৯২২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘উচ্চ ইংরেজি স্কুল’ হিসেবে এটি স্থায়ী অনুমোদন লাভ করে। সেই সময়ের বিচারে এ অনুমোদন ছিল বিদ্যালয়ের মর্যাদা ও শিক্ষার মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
এরপর কেটে গেছে বহু দশক। বদলেছে শাসনব্যবস্থা, বদলেছে সমাজ, বদলেছে শিক্ষার ধরন। কিন্তু বসুন্দিয়ার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ বিদ্যালয়টির ইতিহাসেও গভীর ছাপ ফেলে। দেশভাগের পর বিদ্যালয়ের অধিকাংশ হিন্দু শিক্ষক ও ছাত্র দেশত্যাগ করায় প্রতিষ্ঠানটি একদিকে যেমন অভিজ্ঞ শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থী হারায়, অন্যদিকে তেমনি তার স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রমেও দেখা দেয় সংকট।
ব্রিটিশ আমলের অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক লক্ষ্মী নারায়ণ শিকদার ১৯৪৮ সালে পদত্যাগ করেন। তাঁর পর যশোর শহরের খড়কির মো. সোবহান বকস প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তিনিও ওই বছরেই পদত্যাগ করেন। তাঁর স্থলে যশোরের কাজী আতিয়ার রহমান প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিও ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। ফলে একের পর এক প্রধান শিক্ষক পরিবর্তনের কারণে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষাকার্যক্রমে স্থিতিশীলতা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সময় খড়কির আবদুল মতিন ও মোশারেফ হোসেন খান পর্যায়ক্রমে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৫০ সালের ১ মার্চ শার্শার ইদ্রিস আলী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল নেতৃত্বের অভাব বিদ্যালয়ের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছিল।
১৯৫৬ সালে মো. ইদ্রিস আলী পদত্যাগ করলে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুহম্মদ শাহাদত আলী আনসারীকে প্রধান শিক্ষকের পদে উন্নীত করা হয়। তাঁর হাতে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব যায় এমন এক সময়ে, যখন প্রতিষ্ঠানটির সামনে ছিল নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ। প্রায় ১৪ বছর তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ সময়ের নেতৃত্ব বিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শাহাদত আলী আনসারীর সময়ে বিদ্যালয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। ফলে মেয়েদেরও বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়। একটি গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের শিক্ষার দরজা আরও বিস্তৃত হওয়া ছিল নিঃসন্দেহে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। শুধু ছেলেদের জন্য নয়, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে বিদ্যালয়টি তখনকার সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও নতুন পথের সন্ধান দেয়।
এই সময় বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নও ঘটে। সরকার বিদ্যালয়টির উন্নয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং টিনের ঘরগুলো ধীরে ধীরে পাকা ভবনে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রতিষ্ঠানটির ভৌত অবকাঠামোও পরিবর্তিত হতে শুরু করে।
বিদ্যালয়ের উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। শ্রী বিনোদ বিহারী কাপুড়িয়া দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি হিসেবে ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে স্থানীয় হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আন্তরিকভাবে কাজ করা হয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত যে কেবল সরকারি উদ্যোগে নয়, স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতাতেও শক্ত হয়- বসুন্দিয়া স্কুলের ইতিহাসে তারও নজির রয়েছে।
১৯৭০ সালে শাহাদত আলী আনসারী প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রী বিমল মুখার্জীর ওপর দায়িত্ব বর্তায়। পরে আবদুল আলীম ও বিমল মুখার্জী অল্প সময়ের জন্য প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মো. মোকসেদ আলী খান দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পদত্যাগের পর লোকমান হোসেন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রধান শিক্ষক পরিবর্তনের এই দীর্ঘ তালিকা আসলে একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ইতিহাসের চেয়েও বেশি কিছু বলে। এর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, একটি শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, দেশভাগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্থানান্তর, অবকাঠামোগত সংকট- সবকিছুর মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
বসুন্দিয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর ধারাবাহিকতা। ১৯১৯ সালে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এক শতাব্দী পেরিয়ে আজ আর শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে নেই। উচ্চমাধ্যমিক শাখা চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কলেজে রূপান্তরের প্রক্রিয়া কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে। ফলে শতবর্ষ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন পরিচয়ে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সামনে আরও বিস্তৃত শিক্ষার দুয়ার খুলে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালে ১০৭ বছর পূর্ণ করার মুহূর্তটি বসুন্দিয়া জনপদেরও এক দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাসের উদযাপন। যে সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘উচ্চ ইংরেজি স্কুল’ হিসেবে স্থায়ী অনুমোদন পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি, তখন এই জনপদের সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থা আজকের মতো ছিল না। সেই সময়ের একটি বিদ্যালয় কীভাবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক, আর সেখান থেকে কলেজে পরিণত হয়েছে- তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরিবর্তনশীল বাংলার শিক্ষা-ইতিহাসের একটি ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
একশ সাত বছর আগে যে জমিতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন ডা. শরৎচন্দ্র ঘোষ, সেই আলো আজও নিভে যায়নি। জিতেন্দ্র মোহন সিংহ থেকে শুরু করে পরবর্তী বহু প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, স্থানীয় হিতাকাঙ্ক্ষী এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর হাত ধরে সেই আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছেছে। কেউ এসেছেন, কেউ চলে গেছেন; ভবনের চেহারা বদলেছে, পাঠের বিষয় বদলেছে, শিক্ষাব্যবস্থার ধরন বদলেছে- কিন্তু শিক্ষার মূল আকাঙ্ক্ষাটি থেকে গেছে একই।


























