মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৯১৪ সালে যশোরের জেলা জজের সিন্দুকের দাম ১৭৫ টাকা, উন্নত মানেরটি ২১০

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৩৯, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৮:৩৯, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৯১৪ সালে যশোরের জেলা জজের সিন্দুকের দাম ১৭৫ টাকা, উন্নত মানেরটি ২১০

সিন্দুক বাঙালির ঘরে কবে থেকে ঢুকেছিল- এর নির্দিষ্ট সাল বলা কঠিন। কারণ টাকা-পয়সা, দলিলপত্র, গয়না ও মূল্যবান জিনিস রাখার জন্য কাঠের বাক্স, লোহার পেটিকা কিংবা বিভিন্ন ধরনের কৌটা-সিন্দুক বাংলায় বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হতো। তবে আধুনিক অর্থে তালাবদ্ধ, ভারী লোহার সেফ বা নিরাপদ সিন্দুক ব্রিটিশ আমলে কলকাতাকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও প্রশাসনের বিস্তারের সঙ্গে বাঙালি সমাজে প্রবেশ করে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির পুরোনো হিসাবেও। ১৮৫১ সালের হিসাবপত্রে সোসাইটির জন্য একটি ওৎড়হ ঈযবংঃ কেনার বাবদ ৪৬ টাকা ৪ আনা ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি কলকাতায় লোহার সিন্দুক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ১৮৫৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির নথিতেও মূল্যবান সংগ্রহ নিরাপদে রাখার জন্য একটি রৎড়হ ংধভব কেনার সিদ্ধান্তের উল্লেখ আছে। 
পরবর্তী সময়ে কলকাতায় লোহার সিন্দুকের ব্যবহার আরও ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯৬ সালের অসৎরঃধ ইধুধৎ চধঃৎরশধ-র একটি বিজ্ঞাপনে কলকাতার উ. গ. উধং ্ ঈড়. ঈযরঃঢ়ঁৎ খড়পশ ধহফ ঝধভব ডড়ৎশং-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বলে বিজ্ঞাপনে জানানো হয়েছিল এবং তারা বিভিন্ন ধরনের তালা ও রৎড়হ ংধভব সরবরাহ করত। 

বাঙালি মধ্যবিত্ত ও বিত্তশালী সমাজেও তখন লোহার সিন্দুকের প্রবেশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে বাইরে উপন্যাসে অর্থ রাখার জন্য রৎড়হ ংধভব-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে বাড়ির ঘরের একটি লোহার সেফে টাকা রাখা ছিল। সমকালীন বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণাতেও উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ার বাংলা কথাসাহিত্যে ‘রৎড়হ যড়ঁংবযড়ষফ ংধভবং’-এর বারবার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 
এই ইতিহাসের একটি চমৎকার দলিল পাওয়া গেছে যশোরের জেলা জজের দপ্তরের পুরোনো কাগজপত্রে। ১৯১৪ সালের মার্চ মাসে যশোরের জেলা জজ কলকাতার ড. খবংষরব ্ ঈড়.-এর কাছে একটি সিন্দুক কেনার জন্য চিঠি লিখেছিলেন। এর জবাবে কলকাতার প্রতিষ্ঠানটি ১২ মার্চ ১৯১৪ তারিখে যশোরের জেলা জজকে চিঠি পাঠায়।

চিঠিতে লেখা হয়, জেলা জজের ১০ মার্চের এ/৪৫৬ নম্বর পত্রের জবাবে তারা তাঁর অর্ডারের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু ১৭৫ টাকা মূল্যের ৩৬ ইঞ্চি সাইজের সেফ তখন তাদের কাছে মজুত নেই, সেটি পেতে এক মাস সময় লাগবে। তবে তারা এর পরিবর্তে আরও উন্নত মানের ৩৬ ইঞ্চি ‘গবৎপযধহঃং’ ঝধভব দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেটির দাম ২১০ টাকা। শেষে জানতে চাওয়া হয়— জেলা জজ কি উন্নত মানের সেফটি এখনই নিতে চান, নাকি এক মাস অপেক্ষা করবেন।

এখানে ‘ড. খবংষরব ্ ঈড়.’-এর পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল মোটরগাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না; বিভিন্ন ধরনের পণ্যের ব্যবসাও করত। ১৯১০-এর দশকে প্রতিষ্ঠানটির কলকাতায় ব্যবসায়িক অবস্থান ছিল এবং তাদের ঠিকানা ছিল চৌরঙ্গি এলাকায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ, ব্রিটিশ নির্মাতা ঐড়ননং, ঐধৎঃ ্ ঈড়.-এর একটি পুরনো বিজ্ঞাপনে কলকাতার এজেন্ট হিসেবে সরাসরি “ড. খবংষরব ্ ঈড়., ২ ঈযড়ৎিরহমযবব জড়ধফ”-এর নাম পাওয়া যায়; বিজ্ঞাপনে ংধভবং, ষড়পশং এবং ংঃৎড়হম-ৎড়ড়স সধহঁভধপঃঁৎরহম-এর কথাও রয়েছে। 

ফলে যশোরের জেলা জজের ১৯১৪ সালের এই চিঠি তৎকালীন যশোর ও কলকাতার প্রশাসনিক-বাণিজ্যিক যোগাযোগেরও একটি মূল্যবান দলিল। আরও তাৎপর্যের বিষয়, চিঠিটি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে একটি ৩৬ ইঞ্চি লোহার সেফের নির্দিষ্ট বাজারমূল্য।

১৯১৪ সালে সাধারণ মানের ৩৬ ইঞ্চি সেফের দাম ছিল ১৭৫ টাকা। আর উন্নত মানের ‘গবৎপযধহঃং’ মডেলের ৩৬ ইঞ্চি সেফের দাম ২১০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৩৫ টাকা বেশি দিয়ে উন্নত মানের সিন্দুক কেনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

তখনকার সময়ে ১৭৫ বা ২১০ টাকা যে সামান্য অর্থ ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। ১৮৫১ সালে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি একটি লোহার চেস্টের জন্য ৪৬ টাকা ৪ আনা ব্যয় করেছিল— যদিও সেটি ১৯১৪ সালের ৩৬ ইঞ্চি বাণিজ্যিক সেফের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় নয়। আকার, নির্মাণ, অগ্নি রোধী ব্যবস্থা ও তালার প্রযুক্তির কারণে দামের পার্থক্য স্বাভাবিক। 
তবে এই চিঠি থেকে অন্তত এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়— ১৯১৪ সালের যশোরে সিন্দুক ছিল প্রশাসনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অংশ, আর তার জন্য জেলা জজ কলকাতার নামি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি দরদাম করছিলেন। সিন্দুক তখন আর কেবল ধনীর বাড়ির রহস্যময় বাক্স নয়; সরকারি দপ্তর, জমিদারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এবং সচ্ছল বাঙালি পরিবারের অর্থ ও দলিলপত্র রক্ষার অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে।
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: