বাংলাদেশের আমদানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ দ্রুত বাড়ছে। এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। তবে চীন এখনো বড় ব্যবধানে শীর্ষে রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির গতি আরও বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১০১ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ; রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ফলে যেসব পণ্য আগে অন্য দেশ থেকে কেনা হতো, তার একটি অংশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে। জ্বালানি, গম, সয়াবিন ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যে এ পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট।
জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যে বড় উল্লম্ফন
আমদানি বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে জ্বালানি, খাদ্য, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয়ের ৮৩ শতাংশই গেছে মাত্র ১০টি পণ্যে। এসব পণ্যের মোট আমদানি মূল্য ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। তালিকায় রয়েছে এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, লোহা ও ইস্পাতের স্ক্র্যাপ, সয়াবিন অয়েলকেক ও মিল, উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, ব্রিউয়িং ওয়েস্ট এবং তরল প্রোপেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি। চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করেছে পেট্রোবাংলা। এরপর রয়েছে এলপিজি—৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। ওমেরা পেট্রোলিয়াম, সান গ্যাস ও ইউনাইটেড আয়গাজ এলপিজি ছিল বড় আমদানিকারকদের মধ্যে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ কোনো এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করেনি।
খাদ্যপণ্য আমদানিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার গম আমদানি হয়েছে, যার মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরই আমদানি করেছে ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার। আগের বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি ছিল না। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ও সরকারি খাদ্য মজুদের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বাড়ছে।
তৈরি পোশাক খাতেও বাড়ছে মার্কিন তুলা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে মার্কিন তুলা আমদানি ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য তুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়লে একদিকে মার্কিন কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের উৎসেও পরিবর্তন আসছে।
উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন আমদানি বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের ১৩৭ কোটি টাকার তুলনায় বহুগুণ বেশি। একই সময়ে সয়াবিন ও সয়াবিন বীজ আমদানিতেও বেসরকারি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ক্রয় দেখা গেছে।
তবে সব পণ্যে আমদানি বাড়েনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেল আমদানি ৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকায় নেমেছে। লোহা ও ইস্পাতের স্ক্র্যাপ আমদানিও ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা থেকে কমে ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কের এই পরিবর্তনের সঙ্গে দুই দেশের সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির যোগসূত্র রয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশ চুক্তির কাঠামোতে সম্মত হয়। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়া পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনা এবং ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে। উভয় দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আমদানির পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে পোশাকশিল্পের তুলা এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ—বিভিন্ন খাতে মার্কিন পণ্যের প্রবেশ বাড়ছে। তবে এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে আমদানি ব্যয়, বৈশ্বিক বাজারদর, স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়নের ওপর।


























